ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড
অস্ত্র-অর্থদাতাদের সন্ধান মেলেনি ১০ দিনেও
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- মূল আসামির অবস্থানের তথ্য সরকারের কাছে নেই : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
- খুনিদের গ্রেফতারে ব্যর্থ হলে সরকার পতন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং অর্থদাতাদের সন্ধান এখনো পায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি মূল পরিকল্পনাকারীদেরও চিহ্নিত করতে পারেনি। ওসমান হাদিকে হত্যাকারী ঘাতক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ও আলমগীরের অবস্থানও নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। তবে গোয়েন্দাদের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঘাতকরা দেশ ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন।
এ বিষয়ে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ওসমান হাদি হত্যার আসামিরা কোথায় আছে এমন কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই। তবে গ্রেফতারকৃতদের বিষয়ে তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে।
অপর দিকে গতকাল পৃথক স্থানের কর্মসূচিতে ইনকিলাব মঞ্চ ও জুলাই মঞ্চ খুনিদের গ্রেফতারে ব্যর্থ হলে সরকার পতন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিমের বোনের বাসায় অভিযান চালিয়ে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে দু’টি ম্যাগজিন ও গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর ফয়সালের মা ও স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে শ্যালক সিপুর মাধ্যমে তার বন্ধু আরেক ফয়সালকে গ্রেফতার করে র্যাব। তারা সবাই র্যাবের কাছে স্বীকারোক্তি দেন ঘাতক ফয়সাল একটি ব্যাগের ভেতর তিনটি অস্ত্র ভরে সিপু ও ফয়সালের মাধ্যমে নরসিংদীর একটি পুকুরে ফেলে দিতে দেয়। পরে তাদের তথ্যের ভিত্তিতে নরসিংদীতে র্যাবের একটি দল অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে। এরপর একই রাতে ফয়সাল করিমের আরেক সহযোগী কবিরকে গ্রেফতার করে র্যাব। তার কাছ থেকেও খুনিদের সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু অনেক আগেই ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট দিয়ে কিলিং মিশনের দুই হোতা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যায় বলে প্রাথমিকভাবে জেনেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মূল আসামি কোথায় এমন তথ্য সরকারের কাছে নেই : জুলাইযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল কোথায় আছেন, এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, আসামি কোথায় আছে জানলে ধরে ফেলতাম। দেশেও থাকতে পারে, বাইরেও থাকতে পারে। আসামি বৈধভাবে বাইরে যায়নি। অবৈধভাবে গেছে কি না, এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানা নেই।
গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ১৮তম সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের এ কথা বলেন তিনি। উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এ ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হবে না।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ১০ জনকে যৌথ বাহিনী (পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি) গ্রেফতার করেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উদঘাটনসহ গোপনীয়তার স্বার্থে এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত জানানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে তারা আশ্বস্ত করছেন, এ বিষয়ে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। মূল হোতাকে খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে দালালচক্র ফিলিপের সহযোগী পাঁচজনকে আটক করে বিজিবি। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তারা তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
খুনিদের গ্রেফতারে ব্যর্থ হলে সরকার পতনের আন্দোলন : ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংস্কার দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছে জুলাই মঞ্চ। খুনিদের গ্রেফতারে ব্যর্থ হলে সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন এ দুটো সংগঠন। গতকাল সোমবার রাজধানীর শাহবাগে ‘শহীদ হাদি চত্বরে’ সংবাদ সম্মেলন করে হাদির সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগ করেন, এই হত্যা নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্বাচনের আগেই হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ বলছে, বিচারে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং তদন্তের প্রয়োজনে এফবিআইকে যুক্ত করতে হবে। অপর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে জুলাই মঞ্চের অভিযোগ, হাদির খুনিদের ময়মনসিংহে থাকার তথ্য দিলেও তা আমলে নেয়নি সরকার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংস্কার দাবি করেন সংগঠনটির নেতারা। ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী গণসংযোগের জন্য রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গেলে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করা হয়। গুলিটি তার মাথায় লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে হাদিকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে গত বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় বেলা ২টা ৩ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে শহীদ হাদির লাশ চাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাদির লাশের বহনকারী ফ্লাইটটি অবতরণ করে। গত শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শহীদ ওসমান হাদির নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। পরে ঢাবি ক্যাম্পাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফন করা হয় হাদিকে।