টুনির প্রকৃত বন্ধু
Printed Edition
আব্দুস সবুর বিন নূর
হেমন্তের ভোর। হিমশীতল বাতাসে দুলছে গাছের সবুজ পাতা। জেগে উঠেছে দোয়েল, শালিক, ময়না, টিয়া, চড়ুই ও নাম না জানা অসংখ্য পাখি। কিচিরমিচির সুরে গাইছে ভোরের গান। সূর্যিমামাও আড়মোড়া দিয়ে সবে মাত্র হাসল পুবে। মিষ্টি আলোয় হেসে উঠল শিউলি, গন্ধরাজ, কামিনী ও হিমঝুরি ফুল। একে একে জেগে উঠল বনের সব পশুপাখি।
গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো লাল পিঁপড়ে, কালো পিঁপড়ে, আরো কত পিঁপড়ে! বিড়বিড় করে চলল, ওরা খাবারের খোঁজে। শাহি খাট থেকে হাই তুলতে তুলতে উঠল বনের রাজা সিংহরাজ। জাগল হালুম বাঘ, খেকশিয়াল ও ছোট্ট সাদা খরগোশটি। জাগল আরো কত পশু! ছুটল সবাই নিজ নিজ আহার খুঁজতে।
ওই যাহ! ভুলেই গেছি! আরো একটি পাখি আছে এই বনে, যে কিনা এখনো জাগেনি। ঘুমোচ্ছে হাপুস হয়ে। সে হলো ছোট্ট টুনি। চিনলে না বুঝি? ওই যে টুনটুনি নামের ছোট্ট একটি পাখি! ওকেই তো সবাই টুনি বলে ডাকে! সবার প্রিয় পাখি সে। সবাই খুব ভালোবাসে ওকে। ভালোবাসবেই না কেন বলো? ও যে বনের সব পশুপাখির খোঁজখবর রাখে! কারো আহারের অভাব হলে সে নিজের খাবার তাকে খাওয়ায়। কেউ অসুস্থ হলো কিনা সেদিকেও লক্ষ রাখে সে। আর প্রতিদিন ভোরবেলা ও সব পশুপাখিকে জাগিয়ে দেয়। এমন ভালো পাখিকে তো সবাই ভালোবাসবেই, তাই না?
তাই বনের সব পশুপাখিরাও টুনিকে অনেক ভালোবাসে। তবে আজ কী হলো টুনির? এখনও জাগল না কেন সে? বনের পশুপাখিরা ভাবল মনে মনে। কিন্তু পরে একে একে সবাই নিজ নিজ কাজে চলে গেল। হয়তো আজ টুনির খুব ঘুম পেয়েছিল, তাই নিজে জাগতে পারেনি আর অন্যদেরও জাগায়নি। তবে ময়না পাখিটি আহার খুঁজতে গেল না। সেগুন গাছের এক সরু ডালে বসে রইল চুপচাপ। নাহ, টুনি তো অলস নয়! ওকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। ও আমার অনেক দিনের বন্ধু। একসাথে দুজনে খেলাধুলা করি, নাচি-গাই। আহারও সংগ্রহ করি দুজনে মিলে। আজ ওকে একা রেখে আহার খুঁজতে যাই কী করে! নিশ্চয় টুনির কোনো বিপদ হয়েছে। যাই, ওকে একটিবার দেখে আসি। তারপর না হয় আহার খুঁজতে যাব। যেই ভাবা, সেই কাজ। টুপ করে উড়াল দিল ময়না পাখিটি। উড়ে গিয়ে জুড়ে বসল মস্ত কদমগাছে। ওখানেই টুনির বাসা। ডাকল টুনিকে। নাহ, টুনির কোনো সাড়াশব্দ নেই। অবশেষে উড়ে গেল বাসার কাছে। দেখল, টুনি এখনো ঘুমোচ্ছে। ময়না পাখি বলল-
‘বারে, এত দীর্ঘক্ষণ কেউ ঘুমায়? এখনো ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়নি বুঝি? চটজলদি উঠে পড় টুনি! তাড়াতাড়ি খাবার সংগ্রহে যেতে হবে। সবাই চলে গেছে, শুধু আমি আর তুমি বাকি।’ নাহ, টুনি তাও উঠছে না। ‘এ যে বাবু, ওঠো না জলদি করে! সকালের নাশতা খেতে হবে না বুঝি? খাবার সংগ্রহ না করলে খাবে কী, হ্যাঁ?’
কোনোভাবেই টুনিকে জাগানো যাচ্ছিল না। ময়নাপাখি এবার মনে মনে ভাবল, ‘দাঁড়াও, তোমাকে সুড়সুড়ি দেই, তবেই তোমার ঘুম ভাঙবে।’ যেই না ময়না পাখি সুড়সুড়ি দেয়ার জন্য টুনির গায়ে হাত রাখল, অমনি তার হাত উঠল কেঁপে। হায় হায়! টুনির গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! এ জন্যই বুঝি তুমি এখনো ওঠেনি! টুনি কিচ্ছুটি বলল না। শুধু টুলটুল করে তাকিয়ে রইল ময়না পাখির দিকে। ‘এ কী! তোমার চোখে অশ্রু কেন? তুমি কাঁদছ? কেঁদো না টুনি, ভয় পেও না। আমি আছি না? তুমি খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে যাবে। আমি তোমার জন্য ওষুধ নিয়ে আসছি, হ্যাঁ?’
এই বলে ময়না পাখি ফুড়ুত করে উড়াল দিলো। শিশির ভরে আনল একটু মধু, টিয়ে দাদুর কাছ থেকে নিয়ে এলো একটু পানিপড়া। আশপাশ থেকে কিছু কীটপতঙ্গও ধরে আনল। প্রথমেই খাওয়াল পানিপড়া। আর কিছু পানি দিয়ে মুছে দিলো টুনির সারা গা। একটু পরে সামান্য কীটপতঙ্গ খাওয়াল, আর খাওয়াল মধু। তারপর মাথায় জলপট্টি দিলো। এভাবে সারাদিন ময়না পাখিটি টুনির সেবা করল। ধীরে ধীরে টুনি সুস্থ হতে লাগল। টুনির জ্বরের খবর পেয়ে সন্ধ্যাবেলা সব পশুপাখি এসে জড়ো হলো কদমগাছের কাছে। সবাই আফসোস করল- ‘ইস! আমরা কতই না বোকামি করেছি! একটিবার এসে যদি টুনির খবর নিতাম! টুনি তো রোজ সকালে এসে আমাদের খোঁজ নেয়, আমাদের বিপদে পাশে দাঁড়ায়। অথচ আমরা কিনা...’
এভাবে সব পশুপাখি মনে মনে নিজেদের ধিক্কার জানাল। অবশেষে টুনির কাছে ক্ষমাও চাইল তারা-
‘সরি টুনি, আমরা তোমার বিপদের বন্ধু হতে পারিনি। ময়না পাখি কতই না ভালো! সে তোমার বিপদে তোমার পাশে ছিল, তোমার সেবা-শুশ্রূষা করে তোমাকে সুস্থ করে তুলেছে। সেই তো তোমার প্রকৃত বন্ধু। আমরা তোমার প্রকৃত বন্ধু হতে পারলাম না। আমাদের ক্ষমা করে দিও টুনি।’ টুনি ছোট্ট পাখি হলেও, তার মনটা যে বিশাল বড়! তাই সে সবাইকে ক্ষমা করে দিলো। আর বলল- ‘ধুর! কী যে বলো তোমরা! কে বলেছে তোমরা আমার প্রকৃত বন্ধু নও? সত্যি বলতে, তোমরা সবাই আমার বিপদের বন্ধু এবং প্রকৃত বন্ধু।’ হ