মির্জা ফখরুলের জামায়াতকে ‘নির্মূলের’ বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ
Printed Edition
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামায়াতে ইসলামীকে ‘নির্মূল’ করা সংক্রান্ত একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিশ্লেষণ। গত শনিবার নয়াপল্টনে দলের এক যৌথ সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে হলে উগ্রবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির স্থান নেই। সময় এসেছে জামায়াতে ইসলামীর মতো শক্তিকে নির্মূল করার এবং তাদের সঙ্গ ত্যাগ করে একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের এই অবস্থান আকস্মিক নয়; বরং এটি বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি ‘ইমেজ মেকওভার’ বা ভাবমর্যাদা পরিবর্তনের একটি কৌশল হতে পারে। বিশেষ করে ভারতসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে বিএনপিকে একটি উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে উপস্থাপন করতেই জামায়াতের ‘ট্যাগ’ বিসর্জনের এই পথ বেছে নেয়া হয়েছে। তবে সরকার গঠনের আগে জামায়াতের প্রশংসা করা মির্জা ফখরুলের এই ‘ইউটার্ন’ অনেককেই আশাহত করেছে।
বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “এই বক্তব্য অসাংবিধানিক, অনাকাক্সিক্ষত ও অশোভন। মির্জা ফখরুল পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের ভাষায় কথা বলছেন।” জামায়াত নেতার দাবি, বিগত আন্দোলনগুলোতে জামায়াত কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং বিএনপির সাথে জোট করার কারণেই তাদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও অগণিত নেতাকর্মীকে গুম-খুন হতে হয়েছে। এখন সেই মিত্রকে ‘নির্মূল’ করার ডাক দেয়া রাজনৈতিকভাবে অকৃতজ্ঞতা।
বিষয়টি নিয়ে সংসদেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ (কুমিল্লা-৪) বলেন, “সরকারি দলের পক্ষ থেকে এভাবে আরেকটি দলকে নির্মূলের সংস্কৃতি চালু করা হলে তা আবারো ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করবে। আমরা ১৭ বছর ধরে এই নিপীড়নের শিকার হয়েছি, এখন আবার একই ধারা শুরু হওয়া উদ্বেগজনক।”
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না নয়া দিগন্তকে বলেন, “মির্জা ফখরুলকে সজ্জন হিসেবে জানলেও তার মুখে এমন কথা বিশ্বাস করা কঠিন। অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে জড়ালে তারা আবার কোনো বিপর্যয়ে পড়তে পারেন।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জামায়াতকে পুরোপুরি বর্জন করলে বিএনপি রাজপথে সাংগঠনিক শক্তির দিক দিয়ে একা হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একটি সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামী এখন বিএনপির বিকল্প হিসেবে এককভাবে বা সমমনা ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে নতুন মেরুকরণের চিন্তা করছে।
সাবেক একজন সরকারি উপদেষ্টা মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার বিষয়টি বুঝাতে গিয়ে ‘নির্মূল’ শব্দটি ব্যবহার করা গণতান্ত্রিক ভাষায় কতটা মানানসই তা নিয়ে বিতর্ক থেকে যাবে। বিএনপির এই কঠোর অবস্থান কি কেবলই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নাকি দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছেদ- তা সময়ই বলে দেবে।