গ্যাস-চুনাপাথর সঙ্কটে চালু হচ্ছে না ছাতক সিমেন্ট কারখানা

প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯০ শতাংশের বেশি হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৫৮ শতাংশ

Printed Edition

আমিনুল ইসলাম হিরন ছাতক (সুনামগঞ্জ)

হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে আধুনিক প্রযুক্তির নতুন প্ল্যান্ট নির্মাণ শেষ হয়েছে দেড় বছর আগেই। যন্ত্রপাতি স্থাপন ও ট্রায়াল রানও চলছে নিয়মিত। তবু উৎপাদন শুরু হচ্ছে না রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের প্রাচীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডে। কারণ; গ্যাস নেই, নেই চুনাপাথর। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহে জটিলতার কারণে কারখানাটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ২০১৬ সালে ‘ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন পদ্ধতি ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তর (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্প গ্রহণ করে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৬৭ কোটি টাকা, যা পরে বাড়তে বাড়তে ২০২৫ সালের মে মাসে গিয়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৪১৭ কোটি টাকায়। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯০ শতাংশের বেশি হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৫৮ শতাংশ। রোপওয়ে ও গ্যাসলাইন; এই দুই প্রধান সরবরাহ ব্যবস্থার কাজ বন্ধ থাকায় উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না।

ছাতক সিমেন্ট দীর্ঘ দিন ধরে ভারতের মেঘালয়ের কোমোরাহ লাইমস্টোন মাইনিং কোম্পানি (কেএলএমসি) থেকে রোপওয়ের মাধ্যমে চুনাপাথর আমদানি করত। ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ওই রোপওয়ের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ অংশে ভেঙে বিক্রি হয়ে গেছে। নতুন রোপওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও ভারতের অনুমতি না পাওয়ায় পাঁচ বছরেও কাজ শুরু হয়নি। কেএলএমসি জানিয়েছে, চীনা কোম্পানির সংশ্লিষ্টতায় তারা কাজ করতে আগ্রহী নয়, আর ভারতও বিষয়টিতে আপত্তি জানিয়েছে। এতে কূটনৈতিক ও চুক্তিগত জটিলতা আরো বেড়েছে।

অন্যদিকে ড্রাই প্রসেস প্ল্যান্ট চালু করতে আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি গ্যাস প্রয়োজন। এ জন্য ৪৩ কিলোমিটার নতুন গ্যাস সঞ্চালন লাইন স্থাপনের প্রস্তাব থাকলেও পেট্রোবাংলার অনুমোদন এখনো মেলেনি। জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্যাসের নিশ্চয়তা না পেলে সংযোগ দেয়া সম্ভব নয়। বিসিআইসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গাজী কামরুল হোসেন বলেন, অর্থ বরাদ্দ ও প্রস্তুতি থাকলেও অনুমতির অভাবে পুরো প্রকল্প ঝুলে আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সিলেট অঞ্চলে চুনাপাথরের খনি থাকা সত্ত্বেও বিদেশী আমদানির ওপর নির্ভরতা ছাতক সিমেন্টের দীর্ঘ দিনের সমস্যা। দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করলে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়ত। নতুন ড্রাই প্রসেস প্ল্যান্টের উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক দেড় হাজার মেট্রিক টন, যা আগের তুলনায় তিনগুণ। কিন্তু উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় যন্ত্রাংশে জং ধরার ঝুঁকি ও দক্ষ জনবল হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত শুক্রবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিলেও নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি। বিসিআইসি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, গ্যাস ও চুনাপাথরের জটিলতা কাটাতে চেষ্টা চলছে।

অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দ্রুত কূটনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত না এলে হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে। গ্যাস ও চুনাপাথরের সঙ্কট কাটাতে বিকল্প উৎস ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আলোচনাই এখন একমাত্র পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।