জাতিকে মেধাশূন্য করতে ভারত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে : গোলাম পরওয়ার
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
দিল্লির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ভিত্তিতে ভারতীয়রা আমাদের বুদ্ধিজীবী তথা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে দেশকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। গতকাল রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট হলরুমে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এতে সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান। বিশেষ অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা ও ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লা, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য জিয়াউল হাসান, আতাউর রহমান সরকার, জামাল উদ্দিন, মুহিবুল্লাহ, নাসির উদ্দীন প্রমুখ।
গোলাম পরওয়ার বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বুদ্ধিজীবী হত্যার রহস্য রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর কোনো সরকারই এ হত্যাকাণ্ডের বিচারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি; বরং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সব দোষ জামায়াতের ঘাড়ে চাপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হয়েছে। এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে ভারত এবং তাদের এ দেশীয় এজেন্ট জড়িত ছিল, তা ভারতীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি ও লেখকদের লেখনী থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। মূলত, ১৪ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের কথা থাকলেও ভারতীয় পরিকল্পনায় তা দুই দিন বিলম্বিত হয়। আর এ দু’দিনে আমাদের শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, প্রকৌশলী, আইনবিদসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করা হয়েছিল। যাদেরকে সে সময় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তারা স্বাধীনতার সপক্ষে হলেও ভারত ও তাদের এ দেশীয় এজেন্টদের আদর্শবিরোধী ছিল। তাই তাদের পথচলাকে নির্বিঘœ করার জন্যই এই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতাপরবর্তী কোনো সরকারই বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। বরঞ্চ আওয়ামী লীগ তদন্ত রিপোর্ট চাপা দিয়ে রেখেছে। এমনকি চলচ্চিত্রকার শহীদুল্লাহ কায়সারের ভাই জহির রায়হানের অন্তর্ধানের ঘটনা রহস্যাবৃত্তই রয়ে গেছে। তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনার রহস্য উৎঘাটনে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানান ।
জামায়াতের সেক্রেটারি বলেন, জুলাই বিপ্লবকে নস্যাৎ করার জন্যই বিপ্লবের অন্যতম সিপাহসালার ওসমান হাদির ওপর বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। অথচ তাকে বারবার প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হলেও সরকার তার নিরাপত্তার জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারের পক্ষে জনগণের নিরাপত্তায় বিদেশ থেকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি আমদানির কথা বলা হলেও এসব কখনোই জনগণের কল্যাণে আসেনি; বরং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে এসব প্রযুক্তি জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে জুলুম-নির্যাতন ও গণহত্যা চালানো হয়েছে। তিনি ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিষয়ে বলেন, বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে সমতা ও নায্যতার ভিত্তিতে। আমরা দেশটির সাথে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক চাই না। আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপও কাম্য নয়। তিনি ওসমান হাদির উন্নত চিকিৎসা ও জুলাইযোদ্ধাসহ জাতীয় নেতাদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। অন্যথায় আগামী নির্বাচন ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেন।
সুদানে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের শাহাদতে শোক : সুদানের আবেই এলাকায় অবস্থিত জাতিসঙ্ঘের একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী সদস্য শাহাদত বরণের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ। আমি এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। একই সাথে এই হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি এবং শহীদদের পরিবার ও আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের এই আত্মত্যাগে আমরা বীর জাতি হিসেবে গর্বিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসঙ্ঘের অধীনে পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ঝুঁঁকিপূর্ণ দায়িত্ব নিষ্ঠা ও বীরত্বের সাথে পালন করে চলেছে। এ পর্যন্ত বাংলার শান্তিসেনারা কম্বোডিয়া, সাবেক যুগোস্লাভিয়া, ইন্দোনেসিয়ার পূর্ব তিমুর, আফ্রিকার সিরেরালিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদানসহ বিভিন্ন দেশে পেশাদারি ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে সেসব দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অর্জন বিশ্ববাসীর ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলার অকুতোভয় সেনাদের সাহস, ধৈর্য ও বীরত্বের স্বাক্ষরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা ও সুনাম আরো সুদৃঢ় হয়েছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী’ এখন একটি ব্র্যান্ড নেম। তিনি বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতেও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অমূল্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, আমি নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। তাদের শহীদ হিসেবে কবুল করার জন্য এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য মহান রবের কাছে দোয়া করছি। আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসঙ্ঘের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বিশ্বশান্তি মিশনে নিয়োজিতদের নিরাপত্তা আরো জোরদার করার জন্য জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
বিজয় সরণিতে বিক্ষোভ-সমাবেশ : জুলাই বিপ্লব আমাদের মুক্তির সনদ, আর ওসমান হাদি আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই বিপ্লøবের অন্যতম সিপাহসালার; তাই তার ওপর নৃশংস হামলার বিষয়টি দেশপ্রেমী জনতা কোনোভাবেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।
গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিজয় সরণি মোড়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণকারীদের অনতিবিলম্বে গ্রেফতার, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফার্মগেট অভিমুখী এক বিক্ষোভপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
দেশকে মেধাশূন্য করতেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা : রাজশাহী ব্যুরো জানায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরীর নায়েবে আমির ও জামায়াতে ইসলামী মনোনীত রাজশাহী-২ (সদর) আসনের এমপি পদপ্রার্থী ডাক্তার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেছেন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। অথচ মহান বিজয়ের মাত্র দু’দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করা হয়েছিল। মূলত দেশকে মেধাশূন্য ও পরনির্ভরশীল করতেই পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যথাযথ মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন এবং শহীদদের পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
গতকাল রোববার বিকেলে নগরীর দাওয়াতুল ইসলাম ট্রাস্ট মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী রাজশাহী মহানগরী আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতের রাজশাহী মহানগরীর নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট আবু মোহাম্মদ সেলিমের সভাপতিত্বে এবং সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন সরকারের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির রাজশাহী মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ শাহাদাৎ হোসাইন। আবু মোহাম্মদ সেলিম বলেন, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা দায়ী থাকতে পারে। এটা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এটা বের করার দায়িত্ব ছিল স্বাধীনতাপরিবর্তী যারা ক্ষমতায় এসেছিল তাদের; কিন্তু তারা তা করেননি।