সোহাগ হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে

হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় ১১ জন

এস এম মিন্টু
Printed Edition

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী লালচাঁদ মিয়া ওরফে সোহাগ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে খুনিরা জানায়, মামলা থেকে বাঁচতে টেনে হিঁচড়ে মিটফোর্ড হাসপাতাল চত্বরে নিয়ে ধর্ষক সাজিয়ে মব সৃষ্টি করে প্রকাশ্যে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। সোহাগের মৃত্যুর পর যেন অপরাধীদের মামলায় নাম না আসে সেই পরিকল্পনা ছিল গ্রেফতারকৃতদের। সোহাগকে মারধর করার পর উৎসুক জনতা কেউ এগিয়ে না আসায় প্রকাশ্যে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলিয়ে সোহাগকে বীভৎসভাবে হত্যা করা হয়। আর এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের মধ্যে সিসি ক্যামেরা বিশ্লেষণ করে অংশ নেয়া ১১ জনকে শনাক্ত করে পুলিশ। ডিবি পুলিশের হেফাজতে থাকা দুই আসামির জবানবন্দীতে এমন তথ্য উঠে আসে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গত বুধবার বিকেলে সোহাগের দোকানে দলবল নিয়ে যান স্থানীয় মহিন। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে দোকানের মধ্যেই সোহাগকে এলোপাথাড়ি মারধর করতে থাকেন। ওই সময় মহিনের সাথে থাকা লোকজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। প্রাণ বাঁচাতে সোহাগ দোকান থেকে দৌড় দেয়। একপর্যায়ে সোহাগকে ধর্ষক আখ্যা দিয়ে ধাওয়া করে মহিন ও তার সাথে থাকা লোকজন।

মব তৈরি করতে আশপাশের লোকজনকে তারা সোহাগকে মারধরের নির্দেশ দেন। কিন্তু উৎসুক জনতার কেউ তাদের ডাকে সাড়া দেননি। এরপর মহিনসহ অন্যরা সোহাগকে রাস্তার মধ্যে ইট ও কংক্রিটের স্লাব ও পাথর ছুড়ে আঘাত করতে থাকে। তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও লাশের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে তারা উল্লাস প্রকাশ করে।

ওই সূত্র জানায়, গ্রেফতার সাতজনকে গ্রেফতারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তারা পেয়েছে পুলিশ।

ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ও মামলার এজাহারে থাকা আরো দুই আসামিকে গত শনিবার রাতে নেত্রকোনা থেকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তারা হলেন- সজীব বেপারি ও রাজীব ব্যাপারী।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চোরাই তামার তারের ব্যবসার ভাগভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে খুন হন সোহাগ। নিহত সোহাগ ও হত্যা মামলায় গ্রেফতার যুবদল থেকে বহিষ্কৃৃত প্রধান আসামি মাহমুদুল হাসান মহিন ব্যবসায় দীর্ঘদিনের অংশীদার ছিলেন। সম্প্রতি ব্যবসার টাকা এবং মালামাল কেনার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছেন। এসব বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এরই জেরে ঘটেছে নৃশংস হত্যকাণ্ড।

র‌্যাব গত শুক্রবার রাতে কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে আলমগীর (২৮) ও মনির ওরফে লম্বা মনিরকে (৩২) গ্রেফতার করে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ টিটন গাজী নামে একজন এজাহারনামীয় আসামিকে গ্রেফতার করে। টিটন গাজীকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে গত শনিবার বিকেলে আদালতে পাঠায়। আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এর আগে গ্রেফতার মাহমুদুল হাসান মহিন পুলিশের কাছে পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। তারেক রহমান রবিন নামে আরেকজন এজাহারনামীয় আসামি দুই দিনের রিমান্ড শেষে শনিবার ঢাকার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এ নিয়ে সোহাগ হত্যাকাণ্ডে ঘটনায় যৌথবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাব সাতজনকে গ্রেফতার করেছে।

আসামির তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ

নিহত সোহাগের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদি হয়ে কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় ১৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ওই ১৯ জনের নামের তালিকা থেকে তিনজনের নাম বাদ দিয়ে নতুন তিনজনের নাম অন্তভর্ুুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন যুবদল সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না। গত শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল। সেখানে যুবদল সভাপতি এ কথা বলেন।

আবদুল মোনায়েম মুন্না বলেন, ‘আমরা জানতে চাই, কারা, কেন এই তিন আসামিকে বাদ দিয়ে নতুন করে অন্য তিনজনকে আসামি করল?

তিনি আরো বলেন, ‘এ ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজে যাদের দেখা গেছে, আশ্চর্যজনকভাবে তাদের মামলার প্রধান আসামি করা হয়নি। যারা প্রাণঘাতী আঘাতগুলো করেছেন, তারা এখনো গ্রেফতার হননি। এর কারণ বোধগম্য নয়।’

এ ব্যাপারে গতকাল কোতোয়ালি থানার ওসি ইয়াছিন শিকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাদির অভিযোগটি আমরা এজাহার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছি। এ ক্ষেত্রে বাদি আসামির তালিকায় যাদের নাম দিয়েছেন, সেটি পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই পুলিশের। আসামির নামের তালিকা পরিবর্তন করার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে সোহাগের ভাগ্নি মীম আক্তার নয়া দিগন্তকে বলেন, এর মধ্যে একটি কপিতে ১৭ নম্বর আসামির হিসেবে আ: লতিফ মোল্লার ছেলে কাইউম মোল্লা (৪৫), ১৮ নম্বর আসামি হিসেবে হাবিবুর রহমান হবির ছেলে রাকেশ (৩৫) এবং ১৯ নম্বর আসামি হিসেবে রহিম (৩৬) এর নাম উল্লেখ করা আছে। কিন্তু পুলিশ এজাহার হিসেবে যে অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেছে, তাতে এই তিনজনের নাম নেই।

তারা এই তিনজনের নাম বাদ দিয়ে যারা জড়িত নন তাদের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে পুলিশ।

কিলিং মিশনে অংশ নেয় ১১ জন : পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশে থাকা সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পর্যালোচনা করে কিলিং মিশনে সরাসরি ১১ জনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদি হয়ে যে মামলা করেছেন তাতে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। আসামিরা সকলে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সাথে জড়িত। যদিও পুলিশ বলছে আসামির রাজনৈতিক কোনো পদ-পদবি তারা এখন পর্যন্ত খুঁজে পায়নি। ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে এই বীভৎস হত্যাকাণ্ড।

এদিকে, নিহতের স্ত্রী লাকি বেগম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমার স্বামীর দোকান থেকে চাঁদা দাবি করে আসছিল। আমার স্বামী চাঁদা দিতে চায়নি। এ কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

নিহতের বোন ও মামলার বাদি মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, আমার ভাই ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করছিলেন। প্রতি মাসে তারা ভাইয়ের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দেয়ার দাবি করেছিল। তারা আমার ভাইয়ের ব্যবসাও দখল করা চেষ্টা করছিল। এ কারণে তারা আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

যে কারণে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব

পুলিশ ও নিহতের ঘনিষ্টজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগের আমল থেকে বংশাল থানার ডিসি রয় রোডের জননী বোস লেনসংলগ্ন মসজিদের সামনে ভাঙ্গাড়ি মালামালের ব্যবসা করতেন সোহাগ। নিহতের মেয়ে সোহানার নামে দোকানের নাম সোহানা মেটাল করা হয়। রাজধানীসহ সারা দেশের পুরান বৈদ্যুতিক এবং তামার তার কিনতেন সোহাগ। তার এ ব্যবসার সাথে হত্যায় জড়িতদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান মহিনও অংশীদার ছিলেন। আওয়ামী লীগের সময়ে সোহাগ পুরান ঢাকার সাবেক এমপি হাজী সেলিমের শেল্টারে ব্যবসা করতেন। ব্যবসার ৭০ শতাংশ লভ্যাংশ সোহাগ একাই নিতেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চকবাজার এলাকার ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মাহমুদুল হাসান মহিন ব্যবসার ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দাবি করে আসছিলেন। লভ্যাংশ এবং আওয়ামী লীগের সময়ে ব্যবসার লাভের হিসাব নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। এ বিরোধের জেরেই ব্যবসায় আধিপত্য ধরে রাখতে মহানগর (দক্ষিণ) যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের শেল্টারে যায় সোহাগ। অন্যদিকে মহিন ছিল যুবদলের আরেক নেতা ইসহাক সরকারের গ্রুপের। সোহাগ যুবদলের প্রভাবশালী নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের নাম ভাঙ্গিয়ে ভাঙ্গাড়ি ব্যবসা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। হত্যার শিকার হওয়ার এক দিন আগেও কয়েক লাখ টাকার চোরাই তামার তার কিনেন সোহাগ। এতে মহিন তামার তারের ব্যবসা বাবদ তার কাছ থেকে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে ওই দিন গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।