সাহিত্য কবিতা গুলো
তমিজ উদ্দীন লোদী
আমাদের একটি জমি আছে
আর আমাদের একটি জমি আছে
যা ধূসর কুয়াশার চাদরে ঢাকা,
যেখানে পথের শেষ নেই,
শুধু পদচিহ্নের অনন্ত পুনরাবৃত্তি।
সেখানে এক প্রাচীন বটগাছ
মূলোৎপাটিত স্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়ে,
আর তার পাতায় পাতায় জমে থাকে
অব্যক্ত কথার শিশির।
ওই জমিতে সময়ের হাত
লিখে যায় অদৃশ্য ইতিহাস,
আমরা শুধু শুনি দূরের বাতাসে
ভেসে আসা অসমাপ্ত গানের সুর।
সেখানে দুটি ছায়া
একাকার হয়ে যায় সন্ধ্যায়,
তবু আলাদা হয়ে থাকে
প্রভাতের প্রথম রোদ্দুরে।
ওই জমিতে ফসল হয় না,
শুধু জন্মায় স্মৃতির আগাছা-
আমরা পরম যতেœ জল দিই
অনামি এক ফুলের গাছকে।
আরিফ মঈনুদ্দীন
সৌভাগ্যের শেষ অবশেষ
বিনাশের নামতায় উপেক্ষিত দৃষ্টি
বোধের কিনার ঘেঁষে হেঁটে যায়
গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া সময়ের প্রতিটি একক
ফেলে যায় রেশ বিন্দু বিন্দু
অথবা কখনো কখনো অদৃশ্য- শুধু সে-ই জানে যার করাঙ্গুলি
স্পর্শের মাহাত্ম্য নিয়ে হাত রেখেছিল আদিম অভ্যাসে
কতটুকু সীমা জানা থাকার পরও
রিপুর আবদারে ভেসে গেছে পবিত্র আশ্বাস
ত্যাগের মহিমাগান তুচ্ছ করে
আপন সত্তায় সেঁটে দিয়েছে ভোগের স্বরলিপি
এক-দুই-তিন-নন্দনতত্ত্বের খোঁজে আকাশপাতাল চষে
খালি হাতে ফিরে এসে দেখে জবরদস্তি আদায় করা যায় না এসব-
আপনাতেই হাজির হওয়া নদীর কুলকুল ধ্বনি
মৃদুমন্দ দখিনা বাতাস
সবুজের গায়ে কাঁচাসোনা রোদ
লাবণ্যময় রূপমাধুরী ধারণ করা তরুণী সব কটাক্ষে
স্থাপন করেছে পরিণাম
না-পাওয়ার বেদনাকে সঙ্গী করে কী কী ভুল ছিল দেখতে-দেখতে
পাশ কেটে আবারো পাড়ি দিয়েছে
তারা রেখে গেছে রেশ-
রেশ ধরেই এগোতে হবে
দেখে নিতে হবে সৌভাগ্যের শেষ-অবশেষ।
সাজ্জাদ সাদিক
বারবার ফিরে আসি রাজপথে
১৪৪ ভেঙে মিছিলে ছুটে যাই বায়ান্ন সালে
মাতৃভাষা আদায় করব বলে
স্বেচ্ছায় বুকে তুলে নেই ঘাতকের বিদারী বুলেট।
আমি শহীদ হয়ে গেলে বারবার তারা বলে ওঠে,
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,
আমি কি ভুলিতে পারি?’
তারা আমাকে কখনো হারাতে দেয়নি বলে
আমি ফিরে আসি বায়ান্নর রাজপথ হয়ে একাত্তরে
বুকে বহন করে স্বদেশপ্রেমের পুরনো চেতনা।
একটি ফুলকে বাঁচাব বলে সাড়ে সাত কোটি জনতা
নেমে আসি রণাঙ্গনে। আমাকে এবার-
ছিন্নভিন্ন করে ফেলে জলপাই রঙের একটি দানব।
আজো শুনতে পাই, ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’
চব্বিশের অভ্যুত্থানেও তাই রাজপথে ফিরে এসেছি
বুকে ধারণ করে স্বদেশপ্রেমের পুরনো চেতনা।
শারমিন সুলতানা
লেফাফা
এবার যদি আসো-
ইউরোপের বুভুক্ষু মানচিত্র থেকে এক টুকরো শিল্প সাহিত্যের ভেজা জমিন এনো, আমাদের বিস্মৃত সংস্কৃতির বীজ বুনে দেখব- ও মাটিতে পরোবাসী মেদ জমে কি-না।
আর সাথে প্রথম প্রেমের গন্ধ এনো,
বাজারজাত করা এক ঠোঙা রাজনীতি এনো-
বিপণনের জন্য আমাদের এখানকার মস্তিষ্কগুলো দারুণ উপাদেয়। মোটাতাজা। টেকসই। ফাঁকা।
চীন থেকে দুঃখ এনো, ইজিপ্ট থেকে ত্রিভুজ ইতিহাস।
দু’চারটি উপনিবেশিত দুর্দশা এনো
একটা দু’টা সংবিধানের ফাঁকফোকর অলিখিত।
টুপ করে নৈরাজ্য লিখে দেবো। কেউ দেখবে না।
এ শহরে মফস্বল আসে না। বালু দিয়ে গুঁড়ি আর নারকেল ফুল দিয়ে মুরি বানানোর কারিগর ঘুমের দোকান থেকে চুরি গেছে।
মাথা কাটা আর্যরা জাল মেরে তুলে নিয়ে গেছে বিদ্যের কিলবিল। শেলাই করা নাক। তারপর দেশীয় কটুম।
উৎপাত, দুধ-ভাত। মাছি ভনভন।
চমশা ভেঙে গেছে কালের মেঝেতে পড়ে, পৃথিবী চশমার দোকান
তবুও পাওয়ারে মেলে না, আমাদের আকাশ অন্ধ দিনকানা।
চোখ বানানো সিমেন্ট মার্কেট আউন্ট।
এককালে পাওয়া গেলেও এখন যায় না।
এবার যদি আসো
দু’একটা বছরের ক্ষুধা নিয়ে এসো
সাথে নুন, সেদ্ধ মগজ- কাঁচা লঙ্কা।
হৃদয় রেঁধে দেবো,
সাথে যুদ্ধ, পুঁজিবাদী আবহাওয়া, সাম্রাজ্যবাদ, তেঁতো ভাত, নোনা জল-হাওয়া...
না খেয়ে উঠবে না।
শেখ হাফিজুর রহমান
তমসার রাজ্যে
মেরুণ কষ্টের পসরা সাজিয়ে সন্ধ্যার টেবিলে
শীর্ণ কবিতার পাণ্ডুলিপির আয়োজনে শুনি
কর্কশ পদাবলির ঘুংঘুর স্বরবিন্যাস।
অন্তরের করোটি জুড়ে কোটি কোটি দাগ,
স্বার্থের জলসায় বেলাজ হাওয়ায় ওড়ে আপন বৈভব।
অশ্লীল নিকোটিনের ফাঁদে বহুজাতিক অশরীরী আত্মার আত্মস্বর!
সেইসব লোমহর্ষক ট্রাজেডির টোটেম তেলেসমাতি
ঝিমিয়ে পড়ে তমসার রাজ্যে দোদুল্যমান ঘূর্ণিপাকে।
অনাচারী আঁধারের ভেতর ডুবে যায় গোলাপি জোসনা।
আকাক্সক্ষার মেঘপুঞ্জে ঢেকে ফেলি জীবনের সূর্যঘুড়ি।
ডাসা ডালিমের মতো সতেজ জীবনে ঝরে পড়ে অস্ফুট মুকুল।
বসন্তের উত্তরীয় ওড়ায় চোখের দুষ্টু কুটুম!
চিহ্নহীন ছায়ায় যতদূর হেঁটে যায় দৃষ্টি,
তাই বলে কি একদিন ফিরে যাব না-
চন্দন চঞ্চিত চুলে কপোলের কাছে?
কাঙাল আঙুল ছুঁয়ে ফেলে বিশুদ্ধ বিষাদের রেখা।
ভাতের ধবল ধোয়ায় মিলিয়ে যায় বিষণœ চুম্বন দাগ।
আধোঘুম কেটে যাক অন্নের ঘ্রাণ মেখে ক্ষুধার্তের জঠরে।
তবু হাজারও স্বপ্ন ছুঁয়ে শব্দহীন জিহ্বায় লিখে যাবো
তোমাদের ভবিষ্যৎ।