গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে চায় না ইসরাইল
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর প্রধান বা চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জমির রোববার সামরিক এক বিবৃতিতে মন্তব্য করেছেন যে, গাজায় হলুদ রেখা নামে যে সীমারেখা বরাবর দখলদার বাহিনী পিছু হটেছিল, সেটিই এখন গাজা উপত্যকাকে ফিলিস্তিনিদের বাকি অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে আলাদা করা এক নতুন সীমান্ত হিসেবে কাজ করবে।
আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গাজায় অবস্থিত ইসরাইলি সৈন্যদের সাথে আলাপকালে জমির বলেন, ইসরাইলি দখলদার বাহিনী গাজার বিশাল এলাকার ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং এই নিরাপত্তা রেখা বরাবর তাদের অবস্থান ধরে রাখারই ইচ্ছে রয়েছে। জেনারেল ইয়াল জমির হলুদ রেখাটিকে একটি অগ্রবর্তী নিরাপদ বেষ্টনী এবং একই সাথে চলমান সামরিক কার্যকলাপের একটি ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘গাজা স্ট্রিপের বিস্তৃত অংশে আমাদের অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং আমরা সেই প্রতিরক্ষা রেখাগুলোতে থাকব। হলুদ রেখাটি একটি নতুন সীমান্তরেখা, যা আমাদের সম্প্রদায়গুলোর জন্য একটি সামনের রক্ষণাত্মক রেখা এবং অপারেশনাল কার্যকলাপের একটি রেখা হিসেবে কাজ করছে।’
এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দখলদার শক্তি এই রেখাটিকে আগের চুক্তিতে সংজ্ঞায়িত একটি সাময়িক অবস্থান হিসেবে না দেখে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি ভূখণ্ড দখল ও জাতিগত নির্মূলকরণের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুসারে ইসরাইলি বাহিনী এই সীমারেখার পেছনে অবস্থান করছে, যা কার্যত গাজাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। জমিরের এই ঘোষণা দখলদার শক্তির আসল উদ্দেশ্যকে নগ্ন করে দেয়- অর্থাৎ সাময়িক পুনঃস্থাপনার রেখাকে কার্যত এমন এক সীমান্তে পরিণত করা, যা ভূখণ্ডগত চুরিকে পাকাপাকি করবে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুযায়ী, ইসরাইলি সামরিক কমান্ড গত অক্টোবরে গাজা উপত্যকার ভেতরে যুদ্ধবিরতির হলুদ রেখাটিকে বাস্তবিক অর্থে শক্তিশালী এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেয়। তারা সেখানে আউটপোস্ট, দুইতলা বালুর বাঁধ, কাঁটাতার ও হলুদ রঙের কংক্রিটের মার্কার বসানোর পাশাপাশি ড্রোন ও সাঁজোয়া ইউনিট মোতায়েন করে।
সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন যে, চিহ্নিতকরণের কাজটির মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ সম্পূর্ণ হয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের আগের একটি খবরে তুলে ধরা হয়েছিল যে, গাজাকে দুই ভাগ করা এবং তথাকথিত হলুদ রেখার পেছনের এলাকাগুলো পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনাটি মার্কিন বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরাইলি হামলায় শিশুসহ শত শত ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। অন্তত ৩৭০ -৩৭৫ জন নিহত হয়েছেন এবং গড়ে দৈনিক আটজন বেসামরিক মানুষ মারা যাচ্ছেন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, গাজার মানুষকে সুরক্ষা দিতে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর নয়।
নিউ ইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-কাতার ত্রিপক্ষীয় বৈঠক
এএফপি ও আল আরাবিয়া জানায়, নিউ ইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও কাতারের মধ্যে রোববার ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। কয়েক মাস আগে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান দোহায় হামলা চালিয়ে হামাস নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করেছিল, তবে তা ব্যর্থ হয়।
হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তা বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, তবে বিস্তারিত কিছু জানাননি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির পর এটিই তিন দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। এ চুক্তিতে কাতার ছিল প্রধান মধ্যস্থতাকারী। অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, বৈঠকটি আয়োজন করেন হোয়াইট হাউজের দূত স্টিভ উইটকফ। ইসরাইলের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এবং কাতারের ছিলেন একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র একসাথে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছিল। তবে এ চুক্তি এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে, কারণ উভয় পক্ষই একে-অপরকে শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ করছে। শনিবার কাতার ও মিসর ইসরাইলি সেনাদের প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে গাজা সঙ্ঘাতের অবসান ঘটাতে চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হয়।
দোহায় এক কূটনৈতিক সম্মেলনে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আলে সানি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি সম্পূর্ণ হবে কেবল তখনই, যখন ইসরাইলি সেনারা পুরোপুরি প্রত্যাহার হবে এবং গাজায় স্থিতিশীলতা ফিরবে।’ অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, রোববারের বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল গাজা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন। গত ৯ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি বিমান হামলায় দোহায় হামাসের শীর্ষ আলোচক খালিল আল-হায়া ও অন্যদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তবে হামলায় তারা বেঁচে যান, নিহত হন ছয়জন সাধারণ মানুষ। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইসরাইলকে তিরস্কার করেন। অ্যাক্সিওস আরো জানিয়েছে, পরে ট্রাম্পের অনুরোধে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউজ থেকে ফোন করে কাতারের প্রধানমন্ত্রী আলে সানিকে হামলার জন্য ক্ষমা চান।
যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত হামাস ও ইসরাইল
গাজায় ইসরাইলের ‘জাতিগত নিধন’ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হতে প্রস্তুত ইসরাইল ও হামাস। খবর আলজাজিরার। তবে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর ভূমিকা কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয় এবং এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসেম নাঈম রোববার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাবে থাকা অনেক বিষয় নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। নাঈম আরো বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির সময় অস্ত্র ব্যবহার না করা বা অস্ত্র জমা দেয়া নিয়ে তারা আলোচনা করতে প্রস্তুত; কিন্তু নিরস্ত্রীকরণের দায়িত্ব কোনো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী নেবে- এটি তারা মেনে নেবেন না। এ নিয়ে বাসেম নাঈম বলেন, ‘আমরা জাতিসঙ্ঘের বাহিনীকে স্বাগত জানাই, যারা সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান করবে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি তদারক করবে, লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তা জানাবে এবং যেকোনো ধরনের উত্তেজনা প্রতিরোধ করবে।’ কিন্তু হামাস ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ওই বাহিনীর কোনো ধরনের কর্তৃত্ব মেনে নেবে না বলেও জানান নাঈম। হামাস কর্মকর্তার এই বক্তব্যের আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে দেখা করবেন এবং গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার নতুন ধাপে প্রবেশ নিয়ে আলোচনা করবেন।
রোববার নেতানিয়াহু আরো বলেন, (ট্রাম্পের সাথে) বৈঠকের মূল লক্ষ্য হবে গাজায় হামাসের শাসন শেষ করা এবং এটা নিশ্চিত করা যে পরিকল্পনায় দেয়া ‘অঙ্গীকার’ তারা পূরণ করবে। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় অবরুদ্ধ ভূখণ্ডের নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। হামাসের অস্ত্র ব্যবহার না করা বা অস্ত্র জমা রাখার বিষয়ে নাঈম হামাসের যে অবস্থানের কথা বলেছেন, তা ইসরাইলের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবি পূরণ করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। হামাস কর্মকর্তা বলেন, হামাসও প্রতিরোধ করার অধিকার রাখে।
নাঈম আরো বলেন, অস্ত্র নামিয়ে রাখা হতে হবে এমন একটি প্রক্রিয়ার অংশ, যা একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাবে এবং যেখানে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ৫ থেকে ১০ বছর স্থায়ী হতে হবে। গাজার জন্য মার্কিন খসড়া যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি পথ খোলা রাখা হয়েছে; কিন্তু নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তার দাবি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে হামাসকে পুরস্কৃত করা হবে।
গাজা আগ্রাসনে ২২ হাজার ইসরাইলি সেনা আহত
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর প্রায় ২২ হাজার আহত সেনাকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পুনর্বাসন বিভাগে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এসব আহত সেনা। তাদের মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এ খবর জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ নতুন চিকিৎসা আবেদন জমা পড়ে। বর্তমানে পুনর্বাসন বিভাগে মোট ৮২ হাজার ৪০০ আহত সেনা ও সাবেক যোদ্ধা চিকিৎসা নিচ্ছে, যাদের মধ্যে অনেকে আগের যুদ্ধেও আহত হয়েছিল। তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে মোট রোগীর ২৬ শতাংশ নতুন করে আহত হয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে সেনাদের মধ্যে ২৭৯ বার আত্মহত্যার চেষ্টা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬ জন মারা গেছে। অন্য দিকে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের হামলায় গাজায় অন্তত ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। একই সময়ে ইসরাইল লেবানন, ইয়েমেন, ইরান ও সিরিয়ায়ও বিমান হামলা চালিয়েছে।