নীলুর নতুন বন্ধু

Printed Edition
agdum-2
নীলুর নতুন বন্ধু

সাঈদ বারী

নীলু খুব চুপচাপ, শান্ত একটি ছেলে। তার খুব বেশি বন্ধু নেই। স্কুলে যায়, ক্লাস করে, আবার বাসায় ফিরে আসে। অন্য ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলাধুলা করে, হইচই করে; কিন্তু নীলু দূর থেকে শুধু তাকিয়ে থাকে।

একদিন বিকেলে নীলু তাদের বাড়ির পেছনের ছোট্ট বাগানে গিয়ে বসেছিল। হঠাৎ সে দেখে, একটি ছোট্ট শালিক পাখি গাছের নিচে কেমন যেন কাঁপছে। মনে হলো পাখিটার ডানায় আঘাত লেগেছে। নীলু ধীরে ধীরে পাখিটির কাছে গেল। পাখিটি পালানোর চেষ্টা করল; কিন্তু পারল না। নীলু খুব আস্তে করে বলল, ‘ভয় পেও না, আমি তোমাকে কিছু করব না’।

পাখিটিকে সে দু’হাত দিয়ে তুলে নিলো। তার বুকটা ধুকপুক করছিল- এটি ভয় নয়; বরং এক অদ্ভুত মায়া। বাসায় এনে নীলু একটি ছোট বাক্সে নরম কাপড় বিছিয়ে পাখিটিকে রাখল। মা এসে দেখে বললেন, ‘এই পাখিটি কোথা থেকে আনলে?’

নীলু সব খুলে বলল। মা একটু হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে, যতœ নাও। তবে সুস্থ হলে ওকে ছেড়ে দিতে হবে।’ নীলু মাথা নাড়ল। দিন যায়। নীলু পাখিটিকে পানি দেয়, ভাত দেয়, মাঝে মধ্যে গল্পও করে। ‘তুমি জানো, আমার তেমন কোনো বন্ধু নেই’ নীলু একদিন বলল।

পাখিটি চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। যেন সব বুঝতে পারছে।

এক সপ্তাহ পর পাখিটির ডানা বেশ ভালো হয়ে গেল। এখন সে বাক্সের ভেতর লাফাতে থাকে, ডানা ঝাপটায়। নীলুর খুব ভালো লাগে, আবার একটু কষ্টও হয়।

সেদিন বিকেলে মা বললেন, ‘নীলু, আজ পাখিটিকে ছেড়ে দাও। ওর তো নিজের আকাশ আছে।’ নীলুর বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। তবু সে পাখিটিকে নিয়ে বাগানে গেল। দু’হাত খুলে দিলো। পাখিটি প্রথমে একটু দ্বিধা করল। তারপর হঠাৎ করে ডানা মেলে উড়ে গেল উপরে, আরো উপরে। নীলু তাকিয়ে রইল। তার চোখে একটু পানি এসে গেল।

পরের দিন বিকেলে নীলু আবার বাগানে বসেছিল। হঠাৎ কিচিরমিচির শব্দ। সে তাকিয়ে দেখে- সেই শালিক! এবার সে একা নয়, সাথে আরেকটি পাখি।

পাখিটি এসে নীলুর সামনে বসে মাথা কাত করল। যেন বলছে, ‘আমি এসেছি!’

নীলু হেসে উঠল। ‘তুমি আবার এলে?’ সেদিন থেকে রোজ বিকেলে পাখিটি আসে। কখনো একা, কখনো সঙ্গী নিয়ে। নীলু আর একা থাকে না।

একদিন পাশের বাসার রাফি এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কী করো, এখানে একা একা?’

নীলু বলল, ‘আমি একা না, আমার বন্ধু আছে।’ রাফি অবাক হয়ে বলল, ‘কোথায়?’ ঠিক তখনই শালিকটি উড়ে এসে নীলুর কাঁধে বসল। রাফি মুগ্ধ হয়ে বলল, ‘আমাকেও বন্ধু বানাবে?’ নীলু একটু ভেবে হেসে বলল, ‘বন্ধু বানাতে হলে আগে মনটা ভালো হতে হয়’। রাফি মাথা চুলকে বলল, ‘তাহলে আমি আজ থেকেই ভালো ছেলে হয়ে যাবো!’ নীলু হেসে উঠল। ‘তাহলে তো তুমি আজ থেকেই আমার বন্ধু!’ সেদিন থেকে বিকেলের বাগানটা বদলে গেল। আগে যেখানে শুধু নীরবতা ছিল, এখন সেখানে হাসির শব্দ শোনা যায়। নীলু আর রাফি মিলে পাখিদের জন্য ছোট্ট একটি পানির পাত্র রাখে, কিছু দানা ছড়িয়ে দেয়। শালিক পাখিটি প্রায়ই আসে, কখনো তার সঙ্গী নিয়ে, কখনো একাই। একদিন রাফি বলল, ‘জানো নীলু, আগে আমি ভাবতাম বন্ধু মানে শুধু খেলাধুলা। এখন বুঝছি, বন্ধু মানে যতœ নেয়া, পাশে থাকা।’ ঠিক তখনই শালিকটি ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল আকাশের দিকে। দু’জনই তাকিয়ে রইল। রাফি বলল, ‘ও তো আবার চলে গেল!’ নীলু মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘হ্যাঁ; কিন্তু ও আবার আসবে। কারণ ও জানে- এখানে তার বন্ধু আছে।’ সন্ধ্যার আলো নেমে আসছিল। আকাশটা লালচে হয়ে উঠেছে। নীলু আর রাফি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।