মাত্র ১২ দিনে চবিতে পিএইচডি প্রদানের আয়োজন!

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) মাত্র ১২ দিনে পিএইচডি প্রদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একান্ত ব্যক্তিস্বার্থে তৃতীয় মূল পরীক্ষককে থিসিস না পাঠানোসহ পিএইচডি প্রদানের একাডেমিক ধাপগুলো তড়িঘড়ি করে অবিশ্বাস্য সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। একই সাথে মূল্যায়ন কমিটির নিরপেক্ষতা ও উচ্চ শিক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক, পিএইচডি গবেষণারত মোহাম্মদ শামছিল আরেফিনের (রেজিস্ট্রেশন নং : ৩৫, রোল নং : ২০১৯-০১, শিক্ষাবর্ষ ২০১৮-১৯) পিএইচডি থিসিস মূল্যায়ন ও মৌখিক পরীক্ষার কমিটি ২০২৩ সালের ৫ মার্চ বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির ৭৮৫তম সভায় (বিষয় ৯, বিবিধ-৬), ৪ জুন ৪৯তম ফ্যাকাল্টি সভায় (৫নং সিদ্ধান্ত) এবং পরে ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪৪তম একাডেমিক কাউন্সিলে (বিষয়-২) অনুমোদিত হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন সিনিয়র শিক্ষক ও থিসিস সুপারভাইজার এই পিএইচডি প্রদান প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। গত ১৮ নভেম্বর থিসিস মূল্যায়নের জন্য তিনজন মূল পরীক্ষকের মধ্যে তৃতীয় মূল পরীক্ষককে থিসিস না পাঠিয়ে বিকল্প সদস্য পরীক্ষককে পাঠানো হয়, যা একাডেমিক নিয়মের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, পিএইচডি প্রার্থীকে অনৈতিক সুবিধা দেয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ২৬ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে থিসিস পাঠানোসহ অনলাইনে রিপোর্ট চলে আসে। ২৭ নভেম্বরে মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে নেয়ার জন্য ঘোষণা করা হয়। থিসিস পাঠানোর দিন থেকে ১২ দিনের মাথায় অর্থাৎ ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখ পিএইচডি থিসিসের মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। এভাবে মাত্র ১২ দিনে দেশের প্রথম সারির একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে পিএইচডি দেয়ার ব্যবস্থা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অকল্পনীয় ঘটনা বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত তিনজন মূল পরীক্ষকের মধ্যে তৃতীয় মূল পরীক্ষক ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি বর্তমানে কল্যাণী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আশিষ কুমার পাণিগ্রাহীকে থিসিস না পাঠিয়ে বিকল্প সদস্যকে থিসিস পাঠানো হয়েছে। এতে মূল্যায়ন কমিটির নিরপেক্ষতা ও উচ্চ শিক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বর্তমানে থিসিস সুপারভাইজার ছাড়া বাকি দুইজন পরীক্ষকই একই বিশ্ববিদ্যালয় এবং একই বিভাগের (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) যা রহস্যজনক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, পরীক্ষকদ্বয় অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তড়িঘড়ি করে অনলাইনে থিসিস মূল্যায়ন রিপোর্ট পাঠিয়ে দিয়েছেন যা হয়তো আগে থেকেই তৈরি করে রাখার নির্দেশনা ছিল। নতুবা মাত্র দুই-তিন দিনে একটি পিএইচডি থিসিস অধ্যয়ন করে মূল্যায়ন করা ও রিপোর্ট তৈরি করা একেবারেই অসম্ভব। সাধারণত কোনো মূল পরীক্ষককে থিসিস পাঠানোর পর তিনি লিখিতভাবে ওই থিসিস মূল্যায়নে অপারগতা প্রকাশ করলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে বা অনুমতি নিয়ে মূল পরীক্ষকের পরিবর্তে বিকল্প সদস্যকে পাঠানো হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সে নিয়ম না মেনে মূল পরীক্ষককে থিসিস না পাঠিয়েই বিকল্প একজনকে থিসিস পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সমগ্র অনিয়মের পেছনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন সিনিয়র শিক্ষকের ব্যক্তিস্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। মোহাম্মদ শামছিল আরেফিনের পিএইচডি থিসিসটির তত্ত্বাবধায়ক অন্যত্র পদায়িত হবেন বিধায় তিনি গত ১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ছয় মাসের লিয়েন ছুটিতে যান। তাই তার ছাত্রকে দ্রুততম সময়ে নিজের প্রভাব খাটিয়ে পিএইচডি প্রদান নিশ্চিত করতেই নিয়মবিরোধী এই ব্যতিক্রমী দ্রুততা ও তৎপরতা দেখানো হয়েছে। এতে পিএইচডি থিসিসের মানের সাথে আপস করে করা হয়েছে, যা পিএইচডি থিসিস মূল্যায়নের নিয়মবিরোধী ও অগ্রহণযোগ্য বলে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

পিএইচডির মতো উচ্চতর ডিগ্রির ক্ষেত্রে এই ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতে খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে, যা পুরো একাডেমিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক ও শিক্ষক এই প্রতিবেদককে জানান। তারা বলেন, এই অনিয়মের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও পিএইচডির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং দেশের ভেতরে ও বাইরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম চরমভাবে ক্ষুণœ করবে। তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার করতে এই অনিয়ম ও একাডেমিক দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ পর্ষদে উত্থাপন ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবি জানান। চবি প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোছাম্মৎ রাশেদা চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, গত ১৭ নভেম্বর বিভাগের সভাপতি হিসেবে তার কাছ থেকে ওই পিএইচডি থিসিসের ছাড়পত্র নেয়া হয়। এর মাত্র ১২দিনের মাথায় ভাইভাও হয়ে যায়। অথচ ভাইবার নোটিশ তিনি পান ভাইবা হওয়ার পরে। এ ধরনের অবিশ্বাস্য দ্রুততায় পিএইচডির একটি থিসিস মূল্যায়ন উচ্চশিক্ষার মানকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি।