কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলায় নির্দয় বাজেট দিতে হবে
আগামী বাজেট নিয়ে ড. দেবপ্রিয়
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
- এডিপিকে পরিষ্কার না করলে বাজেট হবে গতানুগতিক
- এপ্রিলে অর্থমন্ত্রীকে অবশ্যই অর্থনৈতিক বিবৃতি দিতে হবে
- সরকারের মধ্যে বড় সমস্যা হলো সমন্বয়হীনতা
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জ্বালানি সঙ্কট রাজস্বনীতি, বৈদেশিক খাত ও মুদ্রানীতি- এই তিনটি ক্ষেত্রেই একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটে অতিরিক্ত ব্যয় করার জন্য নতুন সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও চাপে। বৈশ্বিক অস্থিরতা আগের আর্থিক দুর্বলতাগুলোকে প্রকট করেছে। সে জন্য কঠোর আর্থিক বাজেট করতে হবে। সরকারকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নির্দয় হতেই হবে। ভর্তুকির ব্যাপারে তিনি বলেন, কাউকে চুলে ছাড় দেয়া হলে কাউকে ন্যাড়া করাতে হবে। তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে ১০ বছরের পুরনো ও রাজনৈতিক প্রকল্প বাদ দিয়ে পরিষ্কার করে নতুন বাজেট না করলে গতানুগতিক বাজেট হবে। আর সরকারের মধ্যে বড় সমস্যা হলো সমন্বয়হীনতা। এটা দূর করতে হবে।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মেলনকেন্দ্রে মঙ্গলবার ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফ প্রমুখ।
বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারকে স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা দেয়ার পরামর্শ দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, খুব দ্রুত সময়ে সরকারকে তিন-চার মাসের জন্য একটি রূপরেখা দেয়া দরকার। এটিকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি বাজেটকাঠামো করা যেতে পারে। তিনি সরকারের ব্যয় কমাতে ভর্তুকি সামঞ্জস্য করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ভর্তুকির মধ্যে কোনো অন্যায্য আছে কি না, সেটি দেখতে হবে। অর্থাৎ, ভর্তুকির সুবিধা দরিদ্র নাকি ধনী মানুষ পাচ্ছেন, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। নগদ প্রণোদনা দুই-তিন ধাপে কমিয়ে আনতে হবে।
অর্থনীতি ত্রিমুখী চাপে : অর্থনীতি চাপের মুখে উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচির অধীনে দেয়া সংস্কার প্রতিশ্রুতির সাথে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের আইএমএফ শর্ত পূরণ এবং একই সাথে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বজায় রাখার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় হতে পারে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সাথে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ছে, যা টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য অস্থিরতা। কারণ, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই আসে ওই অঞ্চল থেকে।
রাজস্ব আদায়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ধরা : পরাবাস্তব বাজেট না করার ওপর জোর দিয়ে অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়, সেটি যে অর্জিত হবে না, এনবিআরও (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) জানে। তাই রাজস্ব আয়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। তাতে বাজেটের আকার আগের চেয়ে ছোট হলেও করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রশ্নের মুখে পড়লে তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে। তিনি বলেন, কর অবকাশের সুবিধা বাদ দিতে হবে। কর কমিয়ে করজাল বৃদ্ধি এবং কর আদায়ে ডিজিটালাইজেশন ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, সম্পদের ওপর কর বসাতে হবে। এনবিআর দুই ভাগ করার প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা দরকার বলে মত দেন তিনি।
কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্তের মুখে সরকার : ড. দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। রাজস্ব সুরক্ষায় বিদ্যমান জ্বালানি কর কাঠামো বজায় রাখা হবে, নাকি ভোক্তাদের চাপ কমাতে তা কমানো হবে, এই দ্বিধার মুখে পড়েছে সরকার। তিনি জানান, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রায় ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে জেট ফুয়েলের মতো কিছু ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক দামের পুরো প্রভাব দেশীয় বাজারে প্রয়োগ করা হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগে ধীরগতি : ড. দেবপ্রিয় বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে বর্তমানে জিডিপির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা ও ব্যয় বৃদ্ধি বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি বলেন, জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় এমন নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে রাজস্ব শৃঙ্খলা, বৈদেশিক স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। সতর্কভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়া না গেলে জ্বালানি সঙ্কট বড় ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
উন্নয়ন কর্মসূচিকে পরিস্কার করতে হবে : তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) পর্যালোচনার জন্য আগামী ১/২ মাসের মধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এডিপি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। এটি না করে আগের মতো প্রকল্প নিলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। তিনি বলেন, ৪৩টি প্রকল্প আছে ১০ বছর ধরে চলছে। আমাদের ঋণ নিয়ে এডিপি করা হচ্ছে। ৫ বছর ধরে চলছে এমন প্রকল্পের সংখ্যা ৯৬৯টি। ৩৩৮টি প্রকল্প আছে যেগুলোর বয়স ছয় থেকে ১০ বছর হলো। ৪৭.৮ শতাংশ বিনিয়োগ প্রকল্প আছে যেগুলো সর্বোচ্চ চারবার সংশোধন করা হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারকে এখনই ইকোনমিক রিফর্ম কমিশন গঠন করা উচিত। আর তিন মাস পর পর জাতীয় সংসদে অর্থনীতির চালচিত্রের বিবৃতি দেয়ার যে বিধান রয়েছে এটা অর্থমন্ত্রী এপ্রিলে দেবেন বলে আশা করছি। আর এই ধারা যেটা অতীতে নষ্ট করা হয়েছে তা আবার চালু করা হবে।