ফিতনা সমাচার
Printed Edition
মারজানা কুবরা
মুমিনদের জীবন ফিতনা শব্দের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তবু জীবন থেকে ফিতনাকে ডাইভার্ট করা কষ্টসাধ্য। কারণ, ফিতনার আসল পরিচয় অনেকের অজানা। ফিতনা আরবি শব্দ। যার অর্থ-পরীক্ষা, প্রলোভন, বিভ্রান্তি ইত্যাদি। যদি বিশ্লেষণ বাক্যে বলি- শাস্ত্রবিদদের মতে ‘এমন যেকোনো বিষয় যা মানুষের ঈমান, আমল বা সমাজে অস্থিরতা, বিভ্রান্তি ও পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’ কুরআনের আলোকে যদি আরেকটু বিশ্লেষণ করি। তবে ফিতনার ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট পাব। যেমন ধরুন-
আল্লাহর পরীক্ষা : ‘আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো (উভয়) দিয়ে পরীক্ষা করি-এটিই ফিতনা।’ (সূরা আম্বিয়া-৩৫)
শিরক/কুফর : ‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না ফিতনা (শিরক) বিলুপ্ত হয়।’ (সূরা বাকারা-১৯৩) এই আয়াতে শিরককে ফিতনা বলে পরিচয় করানো হয়েছে।
অত্যাচার/জুলুম : ‘ফিতনা (অত্যাচার/ধর্মীয় নিপীড়ন) হত্যার চেয়েও কঠিন।’ (সূরা বাকারা-১৯১) এই আয়াতে ফিতনা দ্বারা জুলুম উদ্দেশ্য। মোদ্দাকথা, আমাদের ঈমান, আমল ও জীবন যাপনের সরল পথে আগত যেকোনো পরীক্ষাই হতে পারে ফিতনা। ফিতনার অপর নাম বিভ্রান্তি। সরল রেখায় আমরা বিভ্রান্তে পড়ি। উত্তম অনুত্তমের দোলাচালে ভোগি এমন বিষয়ই হতে পারে ফিতনা। ফিতনা যেকোনোভাবে, যেকোনো দিক থেকে আসতে পারে। তবে আজ বলব নব্য ফিতনার কথা। মুসলিম সমাজে চলমান নব্য চ্যালেঞ্জিং কিছু বিষয় নিয়ে। ফিতনার শুরুটা হয় ধর্মীয় উদাসীনতা দিয়ে। একজন প্র্যাক্টিসিং মুসলিমের দৈনন্দিন আমল যেমন- নামাজের সুন্নত, নফল আমল, তিলাওয়াতে কমবেশ করা, পর্দায় ঢিলে দেয়া এসবের মাধ্যমে ফিতনা সূচিত হয়। দ্বিতীয় ধাপে এসে, ধর্মকে শুধু নিজের বাহ্যিক এবং ব্যক্তিগত জীবনে সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে নিয়ে আসা। ব্যাপারটি এমন যে, আমার ইবাদত আমি করব। ধর্ম কেবল একটি চ্যাপ্টার হিসেবে দেখা। ধর্মের ব্যাপকতাকে অগ্রাহ্য করা।
একপর্যায়ে একজন মুসলিম ফিতনার এমন ধাপে উত্তীর্ণ হয়। সে নিজের ইবাদাত, ইবাদাতের লক্ষ্য নিয়ে সংশয় হয়ে পড়ে। সংশয়বাদে প্রবেশ করাও অসম্ভব নয়। বর্তমান বস্তুবাদী চেতনার অনুপ্রবেশ মুসলিম জীবনে এনেছে পরিবর্তন। সাজিয়েছে হরেক ফিতনার আসর। তথ্য উন্নতি একই সাথে মুসলিমদের পরিচয় করাচ্ছে নিত্যনতুন ফিতনায়। কখনো বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদে। এই যেমন ধরুন-মেটারিয়ালিসম, ফেমিউনিজম, লিবারেল, সেক্যুলার, কিবা মডারেটর মুসলিম পরিচয়ের উত্থান। এগুলো স্পষ্টত আল্লাহকে অস্বীকার করতে বলে না। কিন্তু অলক্ষে এসবের লক্ষ্য কিন্তু বান্দাকে আল্লাহর বিশ্বাস থেকে ইসলাম থেকে বিচ্যুতির দিকে ধাবিত করা।
এই ফিতনাগুলোর চেয়ে আরো ভয়াবহ কিছু ফিতনা আবার অভ্যন্তরীণ। এই যেমন- মানহাজ, সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক সিচুয়েশনে বিভিন্ন ফেরকা। দল বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সংঘর্ষ। মোট কথা, উম্মাহের বিভাজন। হতে পারে তা কোনো ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে। যার প্রভাব পুরো মুসলিম সমাজে ছড়ায়। নিরপেক্ষ মুসলিমরা দ্বিধায় পড়ে রয়।
কিছু ক্ষেত্রে তাকফির কিংবা চরমপন্থী রূপ লাভ করা গোষ্ঠীও মুসলিম সমাজের জন্য ফিতনা হিসেবে ধরা দেয়। এসব খুবই সূক্ষ্ম বিষয়। ইসলাম কিছু বিষয় ছাড় দিয়েছে, আবার কিছু বিষয়ে দেয়নি। এই ক্ষেত্রে নেতা সাদৃশ্য কেউ ছাড় দেয়া কিংবা না দেয়া নিয়ে চরম অবস্থান নেন। তখন মুসলিম সমাজ বিভ্রান্ত হয়।
এমনও ফিতনা আছে অভ্যন্তরীণরূপে, যা স্পষ্টত কুফর। যেমন- মাজার পূজা, তাবিজ কবজ, পীর মুরিদ খানকা। এসবের মধ্যেও হক্কানি উলামা, পীর মাশায়েখ আছেন। কিন্তু বিভ্রান্তির জন্ম হয় তখন, যখন সব কিছু সহজলভ্য হয়। মানুষ ধর্মীয় জ্ঞানবিমুখ হয়। ফিতনা চারা গজায়।
ফিতনার চরম আরেক সত্য হলো। যা আপনাকে অপ্রকাশ্য নয় শুধু প্রকাশ্যেই বিভ্রান্ত করে দেবে। সময়ের সাথে প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট, গ্লোভাল নেটওয়ার্ক আপডেট হয়েছে। তেমনি মুসলিম সমাজে ফিতনারাও আপডেট হয়েছে। ডালপালা বেড়েছে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষ সমাজ ছুঁয়েছে। একই সাথে বিনোদনের নীলজগতের পদোন্নতি হয়েছে। ডিস্টেন্স কমেছে মানব বিশ্বের। আমদানি হয়েছে সভ্যতার।
এই আরেক ভয়ানক থাবা। ফিতনার এক অন্ধকার জগৎ। বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, বিকৃত মানসিকতা কি ঢুকেনি সমাজে? একেকটি ফিতনা একেকটি চ্যালেঞ্জ। বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, লিভ টুগেদার, সমকামিতা, ট্রান্স জেন্ডার হওয়ার বাসনা। এই সবই মুসলিম সমাজের জন্য এলার্মিং। এগুলো এখন আর সুদূর ইউরোপ, পাশ্চাত্যে থেমে নেই। আমাদের আশেপাশেই বিস্তার লাভ করেছে।
প্রযুক্তি যখন অশ্লীলতা আর পর্নোকে সহজলভ্য করেছে। এসব ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তফাৎ শুধু এই একবিংশ শতাব্দীর শুরু ও শেষের।
ইসলামকে যখন বিশ্ব মিডিয়ায় সন্ত্রাসবাদ, নারী স্বাধীনতার অন্তরায়, নারী পুরুষের সম-অধিকারের অন্তরায়, বিশেষত নারী বিদ্বেষী রূপে উপস্থাপন করা হয়। মুসলিম সমাজ বিভ্রান্ত হয়। চমকদার কথায় বস্তুবাদী চেতনার আস্ফালন ঘটে। ফিতনা শব্দের পরিচয়ের সাথেই মানুষের দূরত্ব হয়েছে। বিভ্রান্তি আর সত্যের তফাৎ অনেকের কাছেই ধোঁয়াশা হয়ে রয়। অভ্যন্তরীণ ফিতনাগুলো তো আরো জটিল। একেকজন একেকজনকে নিচু দেখাতে ব্যস্ত। ভোগবাদী জীবন, ইলমহীন জীবন, কিংবা নিজেকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য জ্ঞানী ধরে নেয়া, অনেক বেশি শো অফ, অনলাইন জগতের অনাকাক্সিক্ষত হাতছানি, সেলিব্রিটি স্বীকৃতির উন্মাদনা, নিজেকে অন্যের চেয়ে উৎকৃষ্ট মনে করা, আত্ম তুষ্টি এসবই ফিতনার নবরূপ।
ফিতনার শিকড় পুরনো। শুধু সময় এবং স্থানের সাথে নাম বদলেছে। আরেকটু যদি যোগ করি, সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শ ভুলে সময়ের সাথে মানুষ ভোগ-বিলাসে গা এলিয়েছে। প্রযুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছে ইলম এবং মনীষীদের থেকে। কুরআনের সাথে আপনা আপনিই দূরত্ব হয়ে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ জানা থাকলেও মর্ম অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। জীবনটা মুসলিম হলেও কর্ম হয়ে গেছে অন্য রকম। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হতে পারে কেবল কুরআনি চর্চার প্রসার, সিরাহ পাঠ এবং গভীর অনুধাবন। ইসলামী জ্ঞানার্জনকে অত্যধিক প্রাধান্য দেয়া। তবেই সত্য-অসত্যের ফারাক স্পষ্ট হবে।
লেখিকা : (কামিল, স্টাডি অব হাদিস), ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।