গাজায় ইসরাইলের নিয়মিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন শান্তিচুক্তিকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিচ্ছে : কাতার
Printed Edition
- গাজায় পাকিস্তানি সেনা পাঠাতে চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প
- ইসরাইল থেকে ১২ ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তি
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের নিয়মিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন গাজা শান্তিচুক্তিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন জসিম আলে সানি। তিনি বলেছেন, এসব লঙ্ঘনের কারণে মধ্যস্থতাকারীরা কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ছেন ও গাজা যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
আলজাজিরা জানায়, বুধবার ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে বৈঠকের পর এই মন্তব্য করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী। সপ্তম যুক্তরাষ্ট্র-কাতার কৌশলগত সংলাপ শেষে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে বিলম্ব ও প্রতিদিনের লঙ্ঘন পুরো প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করছে এবং মধ্যস্থতাকারীদের জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলছে।
গাজা যুদ্ধ বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা কাতার স্পষ্ট করে জানায়, গাজায় মানবিক সহায়তা কোনো শর্ত ছাড়াই প্রবেশ করতে হবে ও চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ অবিলম্বে শুরু করা জরুরি। এই আলোচনা এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং গাজায় মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হচ্ছে।
আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইল অন্তত ৭৩৮ বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এসব হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩৯৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন ও আহত হয়েছেন আরো এক হাজার ৭৫ জন।
আলজাজিরার যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান সংবাদদাতা অ্যালান ফিশার জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের আলোচনায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাধান্য পায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধে চাপ বাড়ানো, যার বেশির ভাগই ইসরাইলি বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া আলোচনায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) গঠনের বিষয়ও উঠে আসে। প্রস্তাবিত এই বাহিনীতে ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্কের সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে। তবে তুরস্কের সম্পৃক্ততায় ইসরাইল আপত্তি জানিয়েছে। পাশাপাশি গাজায় ক্রমবর্ধমান মানবিক সঙ্কট নিয়েও আলোচনা হয়, যেখানে কাতার যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আরো বেশি সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানায়।
গাজায় পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প
গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে (আইএসএফ) সৈন্য পাঠানোর জন্য পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে চাপ দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দু’টি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, মুনির আগামী সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন সফর করবেন এবং বৈঠকে সম্ভবত গাজা নিয়েই আলোচনা হবে। এই বছরের শুরুতে ট্রাম্প মতায় আসার পর থেকে এটি হবে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শালের সাথে তৃতীয় বৈঠক। আগের দু’টি বৈঠক গত সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে হোয়াইট হাউজে হয়েছিল।
গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হলো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী। কিন্তু বেশ কিছু আরব ও মুসলিম রাষ্ট্র এতে অবদান রাখতে অনিচ্ছুক হওয়ায় এটি ধীরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার কাতারের দোহায় মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকম স্থিতিশীলতা বাহিনীর জন্য একটি ম্যান্ডেট প্রতিষ্ঠা এবং বিষয়টি আরো স্পষ্ট করার জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। তবে উপস্থিত ৪৫টি দেশের কেউই এই প্রচেষ্টায় সৈন্য সরবরাহের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। তুরস্ক ও ইসরাইল উভয়কেই সম্মেলন থেকে বাদ দেয়া হয়, যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে এবং বজায় রাখতে সহায়তা করার জন্য তুরস্ক কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি ছিল। ইসরাইল তুরস্কের উপস্থিতির বিরোধিতা করে। ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের দণি এশিয়ার সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, গাজা স্থিতিশীলতা বাহিনীতে পাকিস্তানের অবদান না রাখা ট্রাম্পকে বিরক্ত করতে পারে। এটি পাকিস্তানের জন্য কোনো ছোট বিষয় নয়, কারণ পাকিস্তান মার্কিন বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য তার (ট্রাম্পের) অনুগ্রহে থাকতে আগ্রহী।
উল্লেখ্য, বিশ্বের একমাত্র মুসলিম দেশ পাকিস্তান, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যুদ্ধ-প্রতিজ্ঞ, তারা তিনবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। এই গ্রীষ্মে একটি সংপ্তি সংঘর্ষে জড়িয়েছিল। এই বাহিনী দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্রোহ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবেলা করেছে।
ইসরাইল থেকে ১২ ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তি
ইসরাইলি প্রতিরা বাহিনী গাজা উপত্যকা থেকে আটক ১২ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে তাদের হেফাজত থেকে মুক্তি দিয়েছে। বুধবার ফিলিস্তিনি বন্দীবিষয়ক মিডিয়া অফিস টেলিগ্রামে এক বিবৃতির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে আলজাজিরার এক খবরে জানানো হয়েছে। মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের কেরেম আবু সালেম ক্রসিংয়ে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। বন্দী মুক্তির এই খবরের পাশাপাশি গাজায় একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। সামরিক বাহিনীর প থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের ছোড়া একটি মর্টার শেল ভুলবশত ল্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ার কারণে অন্তত একজন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত এবং আরো বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। অন্য দিকে মুক্তিপ্রাপ্ত ১২ ফিলিস্তিনির পরিচয় বা তাদের আটকের প্রোপট সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
কানাডার এমপিদের পশ্চিমতীরে প্রবেশে বাধার নিন্দা
জর্দান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে অধিকৃত পশ্চিমতীরে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় ৬ কানাডীয় পার্লামেন্ট সদস্যকে (এমপি) ঢুকতে দেয়নি ইসরাইল। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সফরের আয়োজক অলাভজনক সংগঠন ‘দ্য কানাডিয়ান-মুসলিম ভোট’ (টিসিএমভি)। এই এমপিদের সাথে আরো ২৪ জনের একটি প্রতিনিধিদল ছিল। ইসরাইল ও পশ্চিমতীর সফরের অংশ হিসেবে এই এমপি ও প্রতিনিধিরা সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। কানাডায় নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত বলেন, টিসিএমভির সাথে ‘ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইডে’র যোগ রয়েছে। এই বেসরকারি সংগঠনটিকে ইসরাইল সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করেছে। তবে ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইড ও তাদের কানাডা শাখা এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। টিসিএমভিও বলেছে যে, তাদের তহবিল এসেছে কেবল যোগ্য সব দাতাদের কাছ থেকে।
ইসরাইলি সামরিক সংস্থা কোগাট, যারা আলেনবি সীমান্ত পারাপার তত্ত্বাবধান করে, তারা সিবিসি নিউজকে বলেছে, আগাম সমন্বয় ছাড়া আলেনবি সীমান্ত পারাপার এলাকায় পৌঁছানোর পর নিরাপত্তাজনিত কারণে ৩০ জনের ওই দলটিকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এই সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেছে ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস (এনসিসিএম)। সংগঠনটি জানিয়েছে, এমপিদের পাশাপাশি তাদের কর্মী ও কমিউনিটি নেতারাও প্রতিনিধিদলটিতে ছিলেন। প্রবেশে বাধা পাওয়া ছয় কানাডীয় এমপির মধ্যে পাঁচজন মতাসীন লিবারেল পার্টির। আর ষষ্ঠ এমপি জেনি কোয়ান বামপন্থী নতুন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির। তিনি এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। এনসিসিএম জানিয়েছে, সফরের ল্য ছিল মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেণ করা এবং ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক স্টেকহোল্ডারদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ মঙ্গলবার এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে প্রতিনিধিদলটি পশ্চিমতীরে প্রবেশে বাধা পেয়েছে বলে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সীমান্ত পারাপারের সময় কানাডীয় নাগরিকদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কানাডা আপত্তি জানিয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে টিসিএমভির আয়োজনে একই রকম একটি সফরে অংশ নেয়া আরেক কানাডীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলকে ইসরাইল ও পশ্চিমতীরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।
ইউএনআরডব্লিউএ সেবা বন্ধের পরিকল্পনা বিপজ্জনক পদপে : হামাস
হামাস জানিয়েছে, ইসরাইলের নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরা কমিটি ইউএনআরডব্লিউএ কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় সেবা বন্ধের যে পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক এক উত্তেজনাকর পদপে। এ খবর জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর। এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, নেসেটের এই কমিটি ইউএনআরডব্লিউএ কার্যালয়ে পানি ও বিদ্যুৎসহ জরুরি সেবা বন্ধের যে পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, তা ফিলিস্তিনিদের জন্য সংস্থাটির মানবিক ভূমিকা নস্যাৎ করার একটি পরিকল্পিত অপরাধমূলক প্রচেষ্টার অংশ। হামাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসঙ্ঘ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে ইউএনআরডব্লিউএকে ল্য করে ইসরাইলের ধারাবাহিক আক্রমণ বন্ধ করতে এবং সংস্থাটির বিরুদ্ধে নেয়া অবৈধ পদপেগুলো বাতিল করতে ইসরাইলকে বাধ্য করতে। সংগঠনটি আরোবলেছে, গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে সৃষ্ট নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সেবা ও সহায়তা দিতে ইউএনআরডব্লিউর মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সমর্থন জরুরি। এর আগে সোমবার নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরা কমিটি ইউএনআরডব্লিউএ কার্যালয়ে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের প্রস্তাব সংসদে ভোটের জন্য পাঠানোর অনুমোদন দেয়।