২০২২ সালের পর থেকে ৯০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে

এসডিএফের সেমিনারে অর্থ উপদেষ্টা

Printed Edition
back-1
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ‘ভ্যাট দিবস ও ভ্যাট সপ্তাহ-২০২৫’ উপলক্ষে সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন : পিআইডি

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি গত কয়েক দশক ধরে উল্লেখযোগ্য হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ এখন লাখ লাখ মানুষকে আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২২ সালের পর থেকে দারিদ্র্যের পরিমাণ বাড়ছে। প্রায় ৯০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।

গতকাল বুধবার সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) আয়োজিত সেমিনারে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। অর্থ সচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো: শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক।

দরিদ্রকে একটা কঠিন ও কমপ্লেক্স বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আমাদের দেশে বহু দরিদ্র মানুষকে দেখলেই বোঝা যাবে দরিদ্র। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী। আমি বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি উত্তরাঞ্চলের, ইভেন বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুরের বহু মানুষ অর্ধেক সময় পানিতেই থাকে। এ রকম খারাপ একটা জায়গা আছে যেখানে একেবারে স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা। অতএব দারিদ্র্য দূর করা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। তবে বাংলাদেশে একটা ভালো রেকর্ড হলো দারিদ্র্য কমেছে, আমি বলব সাফল্য। ক্রমাগত, বিশেষত ২০১০ থেকে শুরু করে ক্রমাগত কমেছে।

তিনি বলেন, এখন ২০২২ থেকে হঠাৎ করে আবার একটু রিভার্স করেছে। তবে দারিদ্র্যের দুইটা দিক আছে- একটা আমরা সাধারণত বলি স্টেট, মানে অবস্থান। আরেকটা হলো প্রসেস। এখন আমাদের যেটা আছে প্রথম স্টেট। এত বেশি দরিদ্র যে এটাকে তো ট্যাকেল করতে হবে প্রথম। আর প্রসেসটা দরিদ্র; কিন্তু রোজগার জেনারেট হচ্ছে, দিন দিন বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি সবচেয়ে বেশি দুর্বলতা বাস্তবায়নে। আমাদের এখানে বাস্তবায়ন এত খারাপ, এত ভালো ভালো ডিজাইন হয়, কিছু ডিজাইন খুবই ভালো; কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। এই জিনসটাকে আমাদের উন্নতি না করলে, আমাদের জন্য ডিফিক্যাল্ট হবে। দুর্নীতি আছে, আমাদের আইনের কিছু গলদ আছে, আমাদের প্রক্রিয়ায় কিছু গলদ আছে। যা-ই হোক, আমার মনে হয় আমাদের প্রোগ্রেসটা এখনো মোটামুটি ভালো।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এসডিএফের প্রজেক্টটা মোটামুটি ভালো। নারীরাই কিন্তু সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী এবং সবচেয়ে বেশি কর্মঠ। আর টাকা-পয়সার হিসাব রাখতে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। পুরুষদের কাছে টাকা গেলে তো অনেক কিছুই করে। ভারতে স্টাডি হয়েছে দক্ষিণের দিকে পুরুষরা টাকা পেলে নাকি মদ পান করে, সব টাকা তারা খেয়ে ফেলে। এ জন্য নারীর কাছে টাকা দেয়াটাই বেটার। কারণ নারীরা ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ারের দিকে নজর দেয় সবসময়। আর পুরুষরা করে কী নিজেরটা দেখে।

সালেহউদ্দিন বলেন, একটা বিষয় উঠে আসছে শহরে দারিদ্র্য বাড়ছে। তবে ফোকাসটা শহরের ওপর দেয়ার চেয়ে আমি মনে করি সার্বিকভাবে বিকেন্দ্রীকরণ উন্নয়ন করা। শহরের দরিদ্রের ওপর বেশ নজর দিলে পুল ফ্যাক্টর আসবে। শহরে নজর দেয়ার দরকার আছে, তবে গ্রামে বেশি নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, অনেকসময় যারা দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি থাকে, একটু উপরে উঠে হঠাৎ করে ঝড়ঝাপটা বা কিছু হয় আবার নিচে নেমে যায়। এমন ওঠানামার থেকে বেটার হলো উঠে যেন স্থিতিশীল হয়। সেটিই সরকারের চ্যালেঞ্জ, আমাদের সবার চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জটা যেন আমরা মোকাবেলা করতে পারি। এই প্রত্যয়টা নিয়ে যেন আমরা এগিয়ে যেতে পারি।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি গত কয়েক দশক ধরে উল্লেখযোগ্য হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ এখন লাখ লাখ মানুষকে আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০২২ সালের পর থেকে দারিদ্র্যের পরিমাণ বাড়ছে। প্রায় ৯০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।

কর প্রশাসনকে আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে

দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কর প্রশাসনকে আরো আধুনিক, করদাতা-বান্ধব, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। এতে জনগণের ভোগান্তি কমবে এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়বে।

শেরেবাংলা নগরের রাজস্ব ভবনের বহুমুখী হলরুমে গতকাল বুধবার ‘ভ্যাট দিবস ও ভ্যাট সপ্তাহ ২০২৫’ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূলত নির্ভর করে দেশের নিজস্ব সম্পদ আহরণের সক্ষমতার ওপর। বিদেশী ঋণ বা অনুদানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতায় নয়।’

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, দেশে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে ভ্যাট আদায় হলেও অনেক সময় তা সরকারের কোষাগারে পৌঁছায় না। উন্নয়নের জন্য ভ্যাট একটি মডার্ন সিস্টেম। এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। জিডিপির তুলনায় ভ্যাট তেমন নেই।

তিনি বলেন, ভ্যাট যেন সরকারের কোষাগারে পৌঁছায়। দেশে একটা দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে ভ্যাট আদায় হলেও সরকারের কোষাগারে অনেক সময় পৌঁছায় না। বিদেশে ভ্যাট দেয়া ছাড়া ক্রয় করা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে সব স্থানে ভ্যাটের বিষয়টি পৌঁছায়নি।

সালেহউদ্দিন বলেন, কর জিডিপি এত কম। সরকারের সম্পদ না বাড়ালে কাজ করব কিভাবে? রাজস্ব বাড়াতে হবে। কোনো কোনো দেশে কর জিডিপি অনুপাত ২৬ শতাংশের কারণে সে দেশ সেবা পায়। আমাদের দেশে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যেমন- আমাদের দেশে যদি হাসপাতাল ও শিক্ষায় সেবা পাওয়া যায়, তাহলে মানুষ স্বেচ্ছায় রাজস্ব দিতে এগিয়ে আসবে।

তিনি বলেন, এনবিআরকে বলব পরিধি বাড়ান, আধুনিকায়ন করেন। সম্পূরক ডিউটি কমান। না হলে বেশি এগোনো যাবে না। কর দিলাম, সেবা পাবো না। কর দিলে কী লাভ হলো এই প্রশ্ন যেন করতে না পারে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে ও থাকবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, অনেকগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মোমেনটাম তৈরি হয়েছে। সেটাকে ধরে রাখতে হবে। অটোমেটেড করা বড় সাফল্য। ভ্যাট অব্যাহতি কমেছে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, ভ্যাটের বিরোধিতা শুরু থেকে ছিল। ভ্যাট আদায় যতটুকু হওয়ার কথা ছিল, সে তুলনায় পিছিয়ে আছি। তবে সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে ভোক্তাকে ভ্যাট দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ভ্যাট আদায় করে এনবিআরকে দিতে হবে। সেখানে কোনো ব্যত্যয় করা যাবে না।

অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান বলেছেন, রাজস্ব আহরণ হচ্ছে মধু আহরণের মতো। সে কারণে করদাতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাকে সোনার ডিম পারা হাঁসের মতো মেরে ফেললে তো হবে না। হয়রানি বা জুলুম করা যাবে না।

আবদুর রহমান খান বলেন, ভ্যাটের প্রবৃদ্ধি ২০১২ সালে এসে ধাক্কা খায়। নতুন আইন ১৯৯১ সালের আইনের চেয়ে সহজ হওয়ার কথা থাকলেও বরং আরো জটিল হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা ভ্যাট দেন না, বরং জনগণের কাছ থেকে ভ্যাট সংগ্রহ করেন। ভ্যাটের মৌলিক প্রিন্সিপাল হলো : ব্যবসায়ীরা ভ্যাট দেয় না, তারা শুধু কালেক্টর। এটি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান আরো জানান, আয়করে বড় ধরনের লিকেজ রয়েছে। রাজস্বের বড় অংশ আসা উচিত আয়কর থেকে, এরপর ভ্যাট আর কাস্টমস থেকে সবচেয়ে কম। কিন্তু কাক্সিক্ষত হারে আদায় বাড়ছে না। তিনি বলেন, রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে ডিজিটালাইজেশন। ৩২ বছর পরও ওই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি। ব্যয় বেশি হলে, আয় কম হলে, ঋণ বেড়ে যায়। এটা যেমন পরিবারের জন্য সত্য, দেশের জন্যও প্রযোজ্য। গতকাল এই বিষয়টি বলেছিলাম, কিন্তু মিডিয়ায় ভুলভাবে এসেছে। মূল কথা রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে।

আবদুর রহমান বলেন, রাজস্ব বাড়ছে, তবে যে হারে বাড়ার কথা সেই পরিমাণে বাড়ছে না। টার্নওভার তিন কোটি টাকা থেকে ৫০ লাখ করেছি। সাথে সাথে ৫০ লাখ রেজিস্ট্রেশন হওয়ায় কথা। সেটা তো হয়নি। সব তথ্যই ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্টদের কাছে আছে। কারা নেটের বাইরে রয়েছে। এখন অনেকে বিদেশে বিনিয়োগ করতে চায়। কারণ দেশে তারা কর প্রশাসনের সহায়তা পায় না। যারা কর দেয়, তাদের যদি নার্সিং করতে না পারি, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে না।

অনুষ্ঠানে অর্থ সচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মুজুমদার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সচিব মো: শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সচিব নাজমা মোবারেক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো: আনোয়ার হোসেন, এফআইসিসিআই সহসভাপতি ইয়াসির আজমান, আইসিসি বাংলাদেশ সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সত্তার বক্তব্য দেন।

সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভ্যাট অডিট সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন ভ্যাটনীতি সদস্য মো: আজিজুর রহমান।