ইবি অধ্যাপিকাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
অভিযুক্ত কর্মচারীর আত্মহত্যার চেষ্টা
Printed Edition
ইবি সংবাদদাতা
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের এক নারী শিক্ষক কর্মচারীর ছুরিকাঘাতে নিজ কার্যালয়ে খুন হয়েছেন। নিহত শিক্ষিকার নাম আসমা সাদিয়া রুনা। তিনি সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। এ সময় তার কক্ষে একই বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমান আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শাহিনুজ্জামান।
প্রক্টর জানান, ‘বিকেল ৪টার দিকে বিভাগে হামলার খবর পেয়ে আমি দ্রুত সেখানে যাই। আমি আসমা সাদিয়া রুনাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেছি, মুখটি স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা। ফজলুও রক্তমাখা অবস্থায় মেঝেতে ঘোরাঘুরি করছিল। উভয়কেই হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরাও দেখেছেন, তিনি গলার দিকে নিজেই ছুরি চালাচ্ছিলেন।’
প্রক্টর শাহিনুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত কর্মচারী দীর্ঘ দিন ধরে দৈনিক ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। আগে শিক্ষক রুনার সাথে একটি বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্কের পর তাকে অন্য বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে কর্মরত ছিলেন।
২৫০ শয্যার কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক হোসাইন ইমাম জানান, ‘উভয়কেই বিকেল ৫টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। রুনা কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যান। ফজলুর অবস্থা এখনো সঙ্কটজনক।’
প্রক্টর আরো জানান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাস্থলে থাকা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নিয়ামতুল্লাহ মুনিম বলেন, আমরা ম্যাডামকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম, চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। আর যিনি এ কাজ করেছেন ফজলুর রহমান, তিনি নিজেও আত্মহননের চেষ্টা করেন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।’
কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, এ ঘটনা কিভাবে ঘটেছে সে ব্যাপারে পরে জানানো হবে।
এদিকে শিক্ষক ও কর্মচারীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা একজন শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আজকে বিভাগের ইফতার মাহফিল ছিল। বিভাগে পরীক্ষা ছিল। এরপরে আমরা ইফতারের জন্য কক্ষ গোছগাছ করি। ম্যাম, তার কক্ষেই ছিলেন। তখন হঠাৎ করেই আমার এক বন্ধু বলে, ম্যামের কক্ষ থেকে কিসের যেন আওয়াজ আসছে। ‘বাঁচাও বাঁচাও’ এ রকম আওয়াজ আসছে।
‘দরজা সাথে সাথে ভাঙা হয়েছে। তখন দেখলাম, ম্যাম একদিকে পড়ে আছে। আর যে খুন করেছে সে নিজেই নিজের গলা কাটছে।’
ওই শিক্ষার্থী বলেন, পরে পুলিশ, প্রক্টর ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা আসেন। শিক্ষিকা ও কর্মচারীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালে আনার পর শিক্ষিকাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
২৫০ শয্যা কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, ‘শিক্ষিকাকে আমরা মৃত অবস্থায় পেয়েছি। তারপরও ইসিজি করে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছুরিকাঘাত ও রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।’
ক্ষোভ থেকে খুন!
বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ফজলুর রহমান ৮-৯ বছর ধরে চুক্তিভিত্তিক (দিন হাজিরা) সমাজকল্যাণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তার মজুরি বাড়ানো নিয়ে মাস খানেক আগে তার সাথে শিক্ষিকা আসমা সাদিয়ার বাগি¦তণ্ডা হয়। পরে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। সমাজকল্যাণ বিভাগটি দ্বিতীয় তলায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ তৃতীয় তলায়। অনেকের ধারণা, এ ঘটনার ক্ষোভের জেরে আজকের ঘটনা ঘটতে পারে।
নিহত অধ্যাপিকা আসমা সাদিয়ার স্বামী ইমতিয়াজ পারভেজ কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইংরেজির ইনস্ট্রাক্টর। কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়া এলাকায় তাদের বাসা। ইমতিয়াজের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া সদরের বংশীতলা গ্রামে। আসমা সাদিয়ার পৈতৃক বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায়। তাদের সংসারে তাইবা, তাবাসসুম, সাজিদ ও আয়েশা নামে চার ছেলেমেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ের বয়স ৯ বছর। ছোট মেয়ের বয়স মাত্র এক বছর।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সমাজকল্যাণ বিভাগের ইফতার মাহফিল ছিল। এ জন্য বেলা ৩টায় অফিস শেষ হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভাগে অবস্থান করছিলেন। বিকেল ৪টার দিকে ক্যাম্পাসের আনসার সদস্যরা বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষে চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পান। পরে আনসার সদস্যরা বাইরে থেকে দরজা ধাক্কাধাক্কি করেন। এমন সময় ইফতার আয়োজনের দায়িত্বে থাকা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী ধাক্কাধাক্কির কারণ জানতে ওই শিক্ষকের কক্ষের সামনে উপস্থিত হন। পরে দরজা ভেঙে ওই শিক্ষিকার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় কর্মচারী ফজলুর রহমান নিজের গলায় ছুরিকাঘাত করছিলেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠান।
নাবালক সন্তানেরা মাকে খুঁজছে : সন্ধ্যার পর কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে শিক্ষিকার মৃতদেহ ট্রলিতে রাখা আছে। আশপাশে স্বজনেরা কান্না করছেন। স্ত্রী নিহতের খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন স্বামী ইমতিয়াজ। তাকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসা দিয়ে একই হাসপাতালে কিছুক্ষণ রাখা হয়। এক ঘণ্টা পর তাকে বাড়িতে নেয়া হয়। তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন স্বজনেরা। তিনি কান্না করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছিলেন। গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলতে পারছিলেন না।
এ দিকে মায়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে দুই মেয়ে তাইবা ও তাবাসসুম কান্না করছিল। তাবাসসুম তাদের স্বজনদের জড়িয়ে বারবার বলছিল, ‘আম্মু কই, আম্মু কই। আমি আমার আম্মুর কাছে যাব। আম্মুর মুখ দেখব। আমার আম্মুর কাছে নিয়ে যাও।’
রাত ৭টার দিকে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস্) ফয়সাল মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, হত্যায় ব্যবহৃত দু’টি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক আলামত জব্দ করা হয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ক্রাইম সিন ইউনিটসহ বেশ কয়েকটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন।
হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে রাত সোয়া ৮টার দিকে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, শিক্ষিকার কক্ষে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। এমনকি কক্ষের সামনের করিডোরেও ক্যামেরা নেই। তবে নিচতলাতে আছে। সেই ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাহলে মানুষের গতিবিধি দেখা যাবে।