মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় খামেনি নিহত
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
- নেতৃত্ব বদলের আইনি প্রক্রিয়া শুরু
- ইরানের পাল্টা প্রতিশোধ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ৩৭ বছর ধরে নেতৃত্ব দেয়া ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তেহরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি জানায়, “ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা শাহাদাত বরণ করেছেন।” তার মৃত্যুতে ইরানজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে এ ঘটনার অভিঘাত ইতোমধ্যে স্পষ্ট। তেহরান প্রতিশোধের ঘোষণা দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে, আর ইসরাইলে ব্যাপক পেণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়ার মতো সঙ্কট।
আবেগঘন শোক, কঠোর নিরাপত্তা : খামেনির মৃত্যুসংবাদ পাঠ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক উপস্থাপক সরাসরি সম্প্রচারে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য ইরানজুড়ে গভীর আবেগের সঞ্চার করে।
একই সময়ে রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করে আইআরজিসি। সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা ও সীমান্তে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়। নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য নাশকতা বা বিদেশী হামলা ঠেকাতে “ফুল মোবিলাইজেশন” অবস্থায় রয়েছে বাহিনী।
সংবিধান অনুযায়ী কিভাবে নেতৃত্ব বদল হবে : খামেনির মৃত্যুতে ইরান হঠাৎ নেতৃত্বশূন্য হয় না। দেশটির সংবিধানে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে বিশেষজ্ঞ পরিষদ ৮৮ সদস্যের একটি নির্বাচিত ধর্মীয় পরিষদ। জনগণের সরাসরি ভোটে আট বছরের জন্য তারা নির্বাচিত হন। আর এই পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ নেতা ঠিক হয়।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে অস্থায়ীভাবে একটি ‘লিডারশিপ কাউন্সিল’ দায়িত্ব নেয় প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জুরিস্ট। এই কাউন্সিল দ্রুত নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। ইতোমধ্যে আইনজ্ঞ হিসেবে আলিরেজা আরাফির নাম ঘোষণা করা হয়েছে বলে তেহরান সূত্রে জানা গেছে।
সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা কতটা : ইরানে প্রেসিডেন্ট থাকলেও চূড়ান্ত ক্ষমতা সর্বোচ্চ নেতার হাতে। সংবিধান অনুযায়ী তিনি- সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক, যুদ্ধ বা শান্তি ঘোষণা করেন, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও সামরিক কমান্ডার নিয়োগ দেন, প্রেসিডেন্ট অনুমোদন বা অপসারণ করতে পারেন এবং পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির শেষ সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ নতুন নেতা মানেই ইরানের নীতির নতুন দিকনির্দেশনা।
আইন বলছে, ধর্মীয় পরিষদ নির্বাচন করবে, কিন্তু বাস্তবে আইআরজিসির সমর্থন ছাড়া কেউ ক্ষমতায় টিকতে পারে না। বিশ্লেষকদের ভাষায়, “আইনি বৈধতা দেয় আলেমরা, বাস্তব ক্ষমতা দেয় বন্দুক।”
ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়া ধর্মীয় হলেও ফলাফল নির্ভর করতে পারে সামরিক-রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।
প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি ও পাল্টা হামলা : আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী আক্রমণাত্মক অভিযান” শুরু করা হবে। অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দেয়া হয়েছে। ইসরাইলের বেইত শেমেশ এলাকায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে কয়েকজন নিহত ও বহু আহত হওয়ার খবর স্থানীয় গণমাধ্যমে এসেছে। প্রতিরক্ষা বাহিনী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।
এতে প্রক্সি সঙ্ঘাত সরাসরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র যুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ : তেলের বাজারে অগ্নিঝড় : তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ। এই রুট দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করছে- সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগলে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১৫-২০ ডলার পর্যন্ত লাফ দিতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে; বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ ফের তীব্র হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া : ওয়াশিংটন ও তেলআবিব আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার দায় স্বীকার না করলেও মার্কিন রাজনৈতিক মহলে ইরানকে “কৌশলগত হুমকি” হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। আঞ্চলিক মিত্ররা সতর্ক অবস্থানে। উপসাগরীয় দেশগুলো তেল সরবরাহ ও সমুদ্রপথ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেন- সব ফ্রন্টেই প্রক্সি যুদ্ধ তীব্র হতে পারে।
সামনে কী : স্বল্পমেয়াদে তিনটি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে- প্রথমত. সীমিত প্রতিশোধ ও পাল্টা হামলা চলবে; দ্বিতীয়ত. হরমুজে সামরিক সঙ্ঘাত বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে; তৃতীয়ত. দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করবে তেহরান।
কিন্তু নেতৃত্বে যদি কঠোরপন্থী কেউ আসেন, তাহলে পশ্চিমাদের সাথে আপসের সম্ভাবনা কমে গিয়ে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
খামেনি হত্যার পর পাল্টা হামলা, উপসাগর-লেভান্তজুড়ে সঙ্ঘাতের বিস্তার : মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। তেহরান ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে, একই সাথে প্রতিশোধের অঙ্গীকার করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কূটনৈতিক সতর্কতা, সামরিক মোতায়েন এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
তেহরানে বিস্ফোরণ, আকাশ প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি : ইসরাইল বলেছে, তারা তেহরানের পূর্বাঞ্চলে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় টানা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২০০ জন নিহত।
কাশ্মিরে ব্যাপক বিক্ষোভ : ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের শ্রীনগর, বুদগাম, বারামুলা, পুলওয়ামা ও কারগিলে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছে। বিক্ষোভকারীরা কালো পতাকা ও খামেনির ছবি নিয়ে মার্কিন-ইসরাইলবিরোধী স্লোগান দেন।
নিরাপত্তা বাহিনী ইন্টারনেট ধীরগতি করেছে, লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন দুই দিনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে।
ইসরাইলে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে : ইসরাইলের বেইত শেমেশ শহরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে অন্তত ছয়জন নিহত ও বহু আহত হয়েছে বলে জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে। জেরুসালেমের পুরনো শহরের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ওয়ারহেড পড়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
উদ্ধারকারী দল ও মেডিক্যাল ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা আঘাত : ইরানের ড্রোন হামলায় ওমানের দু’ক্ম বন্দর লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের দিকেও বিস্ফোরণের খবর মিলেছে।
ইরাকের বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ঘিরে বিক্ষোভকারীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। জর্দানে মার্কিন দূতাবাস কর্মীদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন।
রাশিয়ার সমবেদনা : রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন খামেনির হত্যাকাণ্ডে সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
সঙ্ঘাত কোন দিকে যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি এখন তিনটি সমান্তরাল ট্র্যাকে এগোচ্ছে- ১. সামরিক ট্র্যাক : ইরান-ইসরাইল সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যুদ্ধে জড়িয়েছে। আইআরজিসির “অভূতপূর্ব প্রতিশোধ” ঘোষণা সঙ্ঘাতকে আরো বাড়াতে পারে।
২. জ্বালানি ট্র্যাক : হরমুজ বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সঙ্কট তীব্র হবে। তেলের দাম বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধাক্কা খাবে।
৩. রাজনৈতিক ট্র্যাক : ইরানে দ্রুত নতুন ঝঁঢ়ৎবসব খবধফবৎ নির্বাচন হবে। যদি কঠোরপন্থী নেতৃত্ব আসে, পশ্চিমাদের সাথে আপসের সম্ভাবনা কমে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী মুখোমুখি অবস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
খামেনির মৃত্যু শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণ বদলে দেয়ার মতো এক ভূরাজনৈতিক মোড়। তেহরানের প্রতিশোধ, ইসরাইলের পাল্টা হামলা, উপসাগরীয় সমুদ্রপথে অচলাবস্থা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’ থেকে ‘প্রসারিত সঙ্ঘাত’-এর দিকে যাচ্ছে। আগামী কয়েক দিনই নির্ধারণ করবে-এই সঙ্কট সীমিত থাকবে নাকি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে।