প্রশ্নের মুখে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে সরানোর এখতিয়ার

Printed Edition

রয়টার্স

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো থেকে সরিয়ে আনার হুমকি দিয়েছেন। এর কারণ ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্ররা ইরান উপকূলের হরমুজ প্রণালীকে অবরোধমুক্ত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে রাজি হয়নি। ফলে এই সামরিক জোট নিয়ে ট্রাম্পের নেতিবাচক মনোভাব আরো তীব্র হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ৭৭ বছরের পুরনো এই ট্রান্স-আটলান্টিক জোট ছাড়তে ট্রাম্প একতরফাভাবে পদপে নিতে পারবেন কি না, তা পরিষ্কার নয়। যদিও তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই বারবার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, আদালতও যার মধ্যে কয়েকটি বহাল রেখেছে।

সংবিধান নির্দিষ্ট করে বলেছে যে সেনেটের পরামর্শ ও সম্মতি নিয়ে প্রেসিডেন্টের চুক্তি করার মতা আছে। তবে এ েেত্র সেনেটর ১০০ সদস্যের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন লাগবে। তবে চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার েেত্র মার্কিন সংবিধানে কিছু বলা নেই।

সোভিয়েত ইউনিয়নের হামলার ঝুঁকি প্রতিরোধের ল্য নিয়ে ১৯৪৯ সালে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা মিলে সামরিক জোট নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি (নেটো) গঠন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার এর বলয়ভুক্ত পর পূর্ব ইউরোপের অনেকগুলো দেশ ন্যাটোতে যোগ দেয়। গঠনের পর থেকেই এ সামরিক জোট পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তার ভিত্তি হয়ে আছে।

১৯৪৯ সালে স্বারিত ন্যাটো চুক্তির ১৩ ধারা অনুযায়ী, এর যে কোনো সদস্য দেশ মার্কিন সরকারের কাছে নোটিশ জমা দেয়ার এক বছর পর নিজেদের প্রত্যাহার করতে পারবে। ওই নোটিশ পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিষয়টি অন্যান্য সদস্যদের জানাবে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো ন্যাটো সদস্য দেশ এই জোট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করেনি।

২০২৩ সালে মার্কিন কংগ্রেস ন্যাটো সংক্রান্ত একটি আইন পাস করে আর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন স্বার করার পর তা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে পরিণত হয়। এই আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট ন্যাটো প্রতিষ্ঠাকারী চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিতে বা যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ স্থগিত, বাতিল করতে বা চুক্তির নিন্দা করতে পারবে না। তবে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চক সেনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য সমর্থন করলে তিনি এর যে কোনোটি করতে পারবেন।

এই আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৮ সালের জাতীয় প্রতিরা অনুমোদন আইনের একটি সংশোধনী হিসেবে পেশ করা হয়েছিল। এটি ছিল পেন্টাগনের নীতি নির্ধারণকারী একটি বড় ধরনের বার্ষিক বিল। এই সংশোধনীর প্রধান উত্থাপনকারী ছিলেন ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট সেনেটর টিম কেইন ও ফোরিডার রিপাবলিকান সেনেটর মার্কো রুবিও। রুবিও এখন ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। মঙ্গলবার রুবিও বলেছেন, ইরান যুদ্ধের পর ওয়াশিংটন ন্যাটোর সাথে তার সম্পর্ক পুনঃপরীা করবে। এনডিএএ সংশোধনীতে আরো বলা হয়েছে, ন্যাটো থেকে প্রত্যাহারের েেত্র কোনো মার্কিন তহবিল ব্যয় করা যাবে না। ট্রাম্প অনেক বছর ধরেই ন্যাটোর তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। ২০২০ সালে তার প্রথম মেয়াদের সময়, মার্কিন বিচার বিভাগের আইনি পরামর্শকের দেয়া এক মতামতে বলা হয়, চুক্তি থেকে সরে আসার একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের, কংগ্রেসের না।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের গবেষণা বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি এই বিষয়টি আদালতে ওঠে তা হলে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের আইনি পরামর্শকের দেয়া মতামত উদ্ধৃত করতে পারে আর এনডিএএ-র সংশোধনীটি অসাংবিধানিক ছিল বলে যুক্তি দেখাতে পারে।

বুধবার ট্রাম্প রয়টার্সকে জানান, তিনি জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে বলবেন যে তিনি জোট থেকে সরে আসার বিষয়টি ‘অবশ্যই বিবেচনা’ করবেন। ন্যাটোর প্রতি তিনি ‘বিতৃষ্ণ’ বলে মন্তব্য করেন। এর কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রতিরমন্ত্রী পিট হেগসেথ ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ফের নিশ্চিত করতে অস্বীকার করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো আইন না, এই দায়বদ্ধতার অভাবই মূল বিষয়।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইউরোপ, রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কার্যক্রমের পরিচালক ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ম্যাক্স বার্গম্যান বলেন, ‘যদি প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনী ন্যাটো ও ইউরোপের নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হন, তা হলে আমার মনে হয় না এটি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কংগ্রেস আদতে কিছু করতে পারবে।’

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান কোনো চুক্তি থেকে নিজ দেশকে প্রত্যাহার করার কর্তৃত্ব রাখেন, যদি সেই চুক্তিতে প্রত্যাহারের অনুমোদন থাকে আর রাষ্ট্র প্রত্যাহার প্রক্রিয়া মেনে চলে। কিন্তু এ েেত্র যুক্তরাষ্ট্রের আইন তেমন পরিষ্কার নয়। যদিও দেশটির প্রেসিডেন্টরা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অনেক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছেন।

যদি এই বিষয়টি শেষে আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তা হলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জটি কঠিন বাধার মুখে পড়বে।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ রণশীল অংশ প্রায়ই ট্রাম্পের পে রায় দেয়, তারা কখনো কোনো চুক্তি প্রত্যাহার মামলার দোষ-গুণ বিচার করে রায় দেয়নি।