আড়াই বছরেও শুরু হয়নি ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ কার্যক্রম

Printed Edition

কাওসার আজম

কৃষিকে ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর এবং প্রকৃত কৃষকের হাতে সরাসরি সরকারি ভর্তুকি পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘পার্টনার’ (প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স)। প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তৎকালীন কৃষিসচিব ওয়াহিদা আক্তার। প্রকল্পের আওতায় ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ বিতরণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় প্রায় ৭২১ কোটি টাকা। তবে প্রকল্প শুরুর প্রায় আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত কৃষকের তালিকা তৈরি বা স্মার্টকার্ড বিতরণ- কোনোটিই শুরু হয়নি।

সরকারের কৃষক স্মার্টকার্ড কার্যক্রম যখন কার্যত স্থবির, তখন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কৃষকদের আকৃষ্ট করতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির মাঠপর্যায়ের প্রচারণায় ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদন পায় পার্টনার প্রকল্পটি। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। মোট ছয় হাজার ৯১০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন এক হাজার ১৫১ কোটি টাকা, বিশ্বব্যাংকের পাঁচ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং ইফাদের ৫০০ কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সাতটি সংস্থা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। দেশের ৬৪ জেলার ৪৯৫ উপজেলায় প্রকল্প কার্যক্রম বিস্তৃত।

প্রকল্পের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল প্রায় দুই কোটি ২৭ লাখ কৃষক পরিবারকে স্মার্টকার্ড প্রদান। জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে কৃষকের তথ্য যুক্ত করে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। এতে ভুয়া তালিকা, দ্বৈত সুবিধা ও মুখস্থ ভর্তুকি বণ্টন বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হয়েছিল। ভর্তুকির অর্থ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কার্ডভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানোর কথা ছিল।

ডিপিপি অনুযায়ী, প্রতিটি কৃষকের জন্য একটি ইউনিক আইডি তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল। কার্ডে কৃষকের এনআইডি নম্বর, ঠিকানা, জমির আয়তন, মৌসুমভিত্তিক আবাদ তথ্য, ফসলের ধরন এবং ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট নম্বর সংরক্ষণের কথা বলা হয়। এসব তথ্য ব্যবহার করে সার ও বীজ ভর্তুকি, কৃষিযন্ত্র প্রণোদনা, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পুনর্বাসন ও সহায়তা দ্রুত নির্ধারণের পরিকল্পনা ছিল। নীতিনির্ধারকদের মতে, এতে কৃষি খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সরকারি অর্থ অপচয় কমবে।

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। উপজেলা পর্যায়ে ডেটা এন্ট্রি, মনিটরিং ও ডাটাভেরিফিকেশন ইউনিট স্থাপনের কথা ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে জমির ব্যবহার, ফসলের ধরন, বন্যা বা খরার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য হালনাগাদ করবেন- এমন পরিকল্পনাও ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলে জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দুর্যোগকালীন পুনর্বাসন ব্যবস্থাও এই ডাটাবেজের আওতায় আনার কথা ছিল।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন। আড়াই বছরেও স্মার্টকার্ড কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় প্রকল্পটি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, বর্তমানে ফিজিক্যাল কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা স্থগিত করে শুধু তথ্য সংগ্রহ ও ডাটাবেজ তৈরিকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

পার্টনার প্রকল্পের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, কৃষক স্মার্টকার্ড আর ফিজিক্যাল কার্ড নয়, এটি হবে ভার্চুয়াল কার্ড বা মোবাইল অ্যাপভিত্তিক। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বেই এখন ভার্চুয়াল কার্ডের দিকে যাওয়া হচ্ছে। আমাদের ক্ষেত্রেও কার্ডের সব তথ্য থাকবে, তবে খরচ কিছুটা কমবে।’ তিনি জানান, বরাদ্দকৃত ৭২১ কোটি টাকার বড় অংশ ব্যয় হবে তথ্য সংগ্রহে।

ডাটা সংগ্রহে বিলম্বের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) এই দায়িত্ব দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা চাওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি। ফলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও টেন্ডারে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রায় দুই কোটি ২৭ লাখ কৃষক কার্ড পাওয়ার কথা থাকলেও প্রকৃত কৃষকের সংখ্যা কমতে পারে বলেও জানান তিনি। ভার্চুয়াল কার্ড চালু হতে কত সময় লাগবে- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ডাটা সংগ্রহের জন্য ফার্ম নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত হলেও সব কার্যক্রম ওই সময়ের মধ্যে শেষ হবে কি না, তা অনিশ্চিত। প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়ার কথাও জানান তিনি। তবে খরচ বাড়বে কি না, তা বিশ্বব্যাংক ও ইফাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।