বাংলাদেশকে প্রশংসায় ভাসাল বিশ্ব
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
তামিলনাড়–র দুই শহর চেন্নাই ও মাদুরাই এবার যেন নতুনভাবে চিনেছে লাল-সবুজকে। জুনিয়র বিশ্বকাপ হকিতে ২৪ দলের এ মহাযজ্ঞে বাংলাদেশের তরুণ, অনভিজ্ঞরা গিয়েছে সাহসী স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্নই প্রথম পর্বের পাঁচ দিনে চেন্নাইয়ের ১২টি দলের চোখকে বিস্মিত ও মুগ্ধ করেছে। যে ১২টি দল মাদুরাইয়ে ছিল তারা কোনো না কোনো মাধ্যমে বাংলাদেশের ঢেউ দেখেছে। কেউ কেউ তো অবাক হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ, তুমি আমাদের ভুল প্রমাণ করলে।’
২৮ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত হওয়া প্রথম রাউন্ডে বাংলাদেশ একটি ম্যাচও জিততে পারেনি। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু ফলাফলের বাইরেও একটি দল কিভাবে নজর কাড়ে, কিভাবে প্রতিপক্ষকে ভাবনায় ফেলে, কিভাবে স্টেডিয়ামের বাতাসে প্রশংসার গুঞ্জন ছড়িয়ে দেয়- এ বিষয়ে বাংলাদেশ যেন হয়ে উঠেছিল এক নিখুঁত উদাহরণ। অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, কোরিয়া তিন শক্তিধর দলের সঙ্গে গ্রুপ এফে ছিল বাংলাদেশ। কেউই কল্পনাও করেনি পুঁচকে বাংলাদেশ এমন জমাট প্রতিযোগিতা দেখাবে।
চেন্নাই ও মাদুরাইয়ের দর্শক, স্বেচ্ছাসেবক, সংগঠক কিংবা অন্যান্য দেশের খেলোয়াড় সবার মুখে একই কথা, বাংলাদেশ, তোমরা খেলা বদলে দিচ্ছ। স্টেডিয়ামের বাইরে যে দিন বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ ছিল, সে দিন স্থানীয় চেন্নাইবাসীর মুখে ভবিষ্যদ্বাণী, ‘১০ গোলের ওপর হারবে বাংলাদেশ।’ কথাগুলো বলা হচ্ছিল আত্মবিশ্বাসের সুরে। ইউরোপ, ওশেনিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার খেলোয়াড়রাও ভেবেছিলেন, বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার গোলবন্যা দেখতে হবে। কিন্তু মাঠে যে গল্প লেখা হলো, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশ। ৫-৩ গোলে লড়াই করে হারের পর স্টেডিয়ামের সবার মুখে একই শব্দ এও কি সম্ভব।
ভিআইপি বক্সে বসা অস্ট্রেলিয়ান সমর্থক মেলন ও লেহই দু’জন বাঙালি দেখেই বলেছিলেন, ‘আজ গ্যাপটা বড় হবে।’ পরে ম্যাচ শেষে নিজেরাই স্যরি বলেছিলেন, আমরা ভাবিনি এমন হবে। তোমরা দুর্দান্ত লড়াই করেছো।
চেন্নাইয়ের মেরিনা অ্যারেনায় স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হারবে, তবে কম ব্যবধানে।’ তার সেই পূর্বাভাসই ম্যাচ শেষে এক ধরনের বাস্তবসম্মত সম্মাননার মতো মনে হয়েছিল। ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, জাপান, কোরিয়া এবং চীনের খেলোয়াড়দের প্রশংসা যেন আরও স্পষ্ট। যারা মাঠে বাংলাদেশের সঙ্গে খেলেনি, তারাও বলতে বাধ্য হয়েছেন ‘এই দলটি আরও ভালো করবে, আরও উপরে উঠবে। আর তোমাদের আমিরুল তো এক্সট্রা অর্ডিনারি। তোমাদের ভরসার জায়গা।’
চিলির গোলরক্ষক ফ্রাঙ্ক সাইমনের প্রশংসা ছিল সরল কিন্তু গভীর। ‘ফ্রেন্ডলি ম্যাচে তোমাদের কাছে হেরেছিলাম, তাই ভেবেছিলাম কিছু একটা করবেই তোমরা। গ্রুপে তোমরা যদি চিলির সঙ্গী হতে, তা হলে প্রতিশোধ নিতে পারতাম।’ তার চোখে-মুখে তখন ম্লান হাসি, আর বাংলাদেশ সম্বন্ধে গভীর সম্মান। সুইজারল্যান্ডের গ্রিমলিচও একই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, ‘প্রাকটিস ম্যাচের হার ভুলি নাই। গ্রুপে থাকলে বদলা নিতাম।’ এই কথাটির ভেতরেও বাংলাদেশের শক্তি ও সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা যায় না।
মাদুরাইয়ে পুলপর্বে ওমানকে ১৩-০, কোরিয়াকে ৫-৩ এবং সবশেষ অস্ট্রিয়াকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে চ্যালেঞ্জার কাপ শিরোপাও জিতে নেয় বাংলাদেশ। আমিরুল হন ছয় ম্যাচে পঞ্চমবারের মতো ম্যাচ সেরা। ১৮ গোল দিয়ে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে। এর পর সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া প্রশংসা চীনের কোচ ইয়ো ইয়ো-এর মুখে। তিনি টেকনিক্যালি ভাঙা ইংরেজিতে বাংলাদেশের প্রশংসা করলেন, ‘চীন অনেক দিন ধরে বাংলাদেশকে চেনে। কয়েকবার চীনে এসে খেলেছো, আমরা অনেককে চিনি। কিন্তু এই টিমটার মতো আগ্রাসী কখনো দেখিনি। সে ক্লাস প্লেয়ার।’
তিনি যোগ করেন, ‘তাদের বন্ডিং খুব ভালো। তারা জানে কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন ডিফেন্স করতে হবে। তারা যদি একে অপরকে এভাবে বুঝে তা হলে আরো ম্যাচিউরিটি আসবে।’
তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি ছিল, ‘পৃথিবীর সব কোচ ভালো, সব খেলোয়াড় ভালো। সমস্যার জায়গা হলো বোঝাপড়া। তোমাদের শুভকামনা।’ এ যেন এক বিশ্বমানের কোচের কাছ থেকে বাংলাদেশের তরুণ হকির জন্য ভবিষ্যতের আশীর্বাদ।
বাংলাদেশের জুনিয়র দল এক নতুন পরিচয়ের বাহক। দলের মধ্যে বোঝাপড়া, দারুণ বন্ডিং, গতি, পাসিং, আক্রমণ ও রক্ষণে ভারসাম্য, বাংলাদেশের জুনিয়ররা যেন নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে লড়াই করতে গিয়েছে। সিনিয়র দল যেখানে মাঝে মাঝে কৌশলের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়, সেখানে জুনিয়ররা প্রতিপক্ষকেই ধাঁধায় ফেলছে। শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সাহসী হকি খেলার মানসিকতা এটাই এই দলের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়।