ঈমানের অপরিহার্য দাবি

Printed Edition
islami logo
ঈমানের অপরিহার্য দাবি

মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম

আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচেয়ে সেরা মানব জাতি। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-‘আমি জিন এবং মানুষকে আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আয-জারিয়াত, আয়াত-৫৬)

আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই পথভোলা প্রত্যেক মানব জাতির মধ্যে পথের দিশা দেয়ার জন্য একজন করে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। যেহেতু আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, হজরত মুহাম্মদ সা:-এর পরে আর কোনো নবী পাঠাবেন না। সেই মহান দায়িত্ব তাঁর প্রিয় বান্দাদের দিয়েছেন। মিথ্যা, অন্যায়, জুলুম-অত্যাচার, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয়, এসব বিষয় দেখে আমাদের নিশ্চুপ থাকার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির (সর্বাত্মক কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভূত করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো ও আল্লাহর প্রতি ঈমান রক্ষা করে চলো।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১১০)

এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন-‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে, আর তারাই সফলকাম।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১০৪)

অবাধ্য বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘তারা যেসব গর্হিত কাজ করত, তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত, নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট।’ (সূরা আল মায়িদা, আয়াত-৭৯)

অসৎকাজে নিষেধ করা মুমিনের অন্যতম গুণ। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-‘তারা হচ্ছে তাওবাকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকু ও সিজদাহকারী, সৎ বিষয় শিক্ষা প্রদানকারী এবং মন্দ বিষয়ে বাধা প্রদানকারী, আল্লাহর সীমাগুলোর (অর্থাৎ আহকামে দীনের) সংরক্ষণকারী; আর তুমি এমন মুমিনদের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও।’ (সূরা তাওবা, আয়াত-১১২)

এমন গুরুত্বপূর্ণ বিধান পালনে নারীদেরও ভূমিকা রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, তারা সবাই পরস্পরের বন্ধু ও সহযোগী। তারা ভালো কাজের হুকুম দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সূরা তাওবা, আয়াত-৭১)

অন্যায়ের বাধা দেয়ার সামর্থ্য না থাকলে কমপক্ষে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করতে হবে। প্রিয় নবী সা: বলেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো খারাপ কাজ বা বিষয় দেখে তাহলে যেন সে তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে দেয়, যদি তা করতে অপারগ হয় তাহলে যেন মুখ দিয়ে তার প্রতিবাদ করে, যদি তাও করতে সক্ষম না হয় তাহলে যেন অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে, আর এটিই হচ্ছে ঈমানের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বলতম স্তর।’ (বুখারি-১৯৪)

সৎকাজের আদেশ অসৎকাজের নিষেধ না করলে দুনিয়াতে কঠিন বিপদের মুখোমুখি হতে হবে এমনকি কারো দোয়াও কবুল করা হবে না।

এ কারণে রাসূল সা: উম্মতকে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতেন। আয়শা রা: বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা:-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে এমন সময় আসার আগে, যখন তোমরা দোয়া করবে কিন্তু তা কবুল হবে না।’ (ইবনে মাজাহ-৪০০৪)

আরেকটি হাদিসে এমনটিই বলা হয়েছে, সাহাবি হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা: থেকে বর্ণিত- রাসূল সা: বলেছেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই তোমরা সৎকাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে আল্লাহ তায়ালা শিগগিরই তোমাদের ওপর তাঁর শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তাঁর কাছে দোয়া করলেও তিনি তোমাদের সেই দোয়া গ্রহণ করবেন না।’ (তিরমিজি-২১৬৯)

এর কারণ হলো- বান্দার গুনাহের কারণে পৃথিবীতে বিপর্যয় নেমে আসে। আর এই বিপর্যয় শুধু আল্লাহর অবাধ্য বান্দাদের জন্য আসে না, মুমিন বান্দাদের ওপরও এ দুর্যোগ পতিত হয়, যেমন- ঝড়, ভূমিকম্প হলে শুধু খারাপ ব্যক্তিদের ওপর পতিত হয় না, সব ব্যক্তিদের ওপর পতিত হয়।

এমনটিই নিম্নোক্ত হাদিসে একটি উদাহরণের মাধ্যমে মহানবী সা: বুঝিয়েছেন-

দাওয়াতের গুরুত্ব বোঝার জন্য এই উদাহরণের কোনো তুলনা হয় না। নোমান ইবনে বশির রা: থেকে বর্ণিত- রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং যে সীমা লঙ্ঘন করে, তাদের দৃষ্টান্ত সেই যাত্রীদলের মতো, যারা লটারির মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিলো। তাদের কেউ স্থান পেল ওপর তলায় আর কেউ নিচতলায় (পানির ব্যবস্থা ছিল ওপর তলায়) কাজেই নিচের তলার লোকেরা পানি সংগ্রহকালে ওপর তলার লোকদের ডিঙ্গিয়ে যেত। তখন নিচতলার লোকেরা বলল, ওপর তলার লোকদের কষ্ট না দিয়ে আমরা যদি নিজেদের অংশে একটি ছিদ্র করে নিই (তবে ভালো হয়) এ অবস্থায় তারা যদি এদের আপন মর্জির ওপর ছেড়ে দেয় তাহলে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা এদের হাত ধরে রাখে (বিরত রাখে) তবে তারা এবং বাকি সবাই রক্ষা পাবে।’ (বুখারি-২৪৯৩)

শুধু সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করলেই কাজ শেষ নয়, নিজেকেও ওই কাজগুলো করতে হবে, না করলে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। উসামা ইবনে যায়েদ নবী সা: থেকে বর্ণনা করেছেন- তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, ফলে তার পেটের নাড়িভুঁড়ি ঝুলে যাবে এবং সে জাহান্নামে পেষণযন্ত্রের চার পাশে গাধা ঘুরার মতো ঘুরতে থাকবে, আর জাহান্নামবাসীরা তার কাছে জমা হবে, তারা (তাকে) বলবে, হে অমুক! তোমার কী হয়েছে? তুমি কি ন্যায়ের আদেশ দিতে না এবং অন্যায়ের নিষেধ করতে না? বর্ণনাকারী বলেন, সে তাদের বলবে, হ্যাঁ আমি তোমাদের ন্যায়ের আদেশ দিতাম; কিন্তু আমি নিজে পালন করতাম না। আর আমি অন্যায়ের নিষেধ করতাম; কিন্তু নিজে অন্যায় করতাম।’ মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করার পাশাপাশি নিজেদেরও আমল করার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক : বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট