বিপুল ভোটে জয়ী হয়েও জনগণকে সেবা দিতে পারছেন না তৃতীয় লিঙ্গের মুন্নি
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
অবজ্ঞা, ঘৃণা আর লাঞ্ছনাকে পাশ কাটিয়ে ভালোবাসা নিয়ে মানুষের সাথে মিশে গিয়েছিলেন তৃতীয় লিঙ্গের মুন্নি আক্তার। মানুষকে ভালোবাসা, সেবা করাই যেন ধ্যান জ্ঞানে পরিণত হয়েছিল। তার এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা সাবলীলভাবে গ্রহণ করেছেন সাধারণ মানুষ।
তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে অবজ্ঞা নয়, বরং তাকেও ভালোসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন জনগণ। যার ফল হিসাবে গত উপজলো নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থীর মাঝে বিপুল ভোটের ব্যবধানে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য সইলো না। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েও জনগণের সেবা করতে পারছেন না জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান তৃতীয় লিঙ্গের মুন্নি আক্তার। তার পদ ফিরে পেয়ে ফের জনগণের সেবা করার সুযোগের দাবি জানিয়েছেন তিনি। এই নিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছেন মুন্নি।
সেখানে তিনি বলেন, আমার পরিচয় সমাজ নির্ধারণ করে দিয়েছে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে, কিন্তু আমার পরিচয় আমি দিতে চেয়েছিলাম একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে। যে বয়সে অন্য শিশুরা মা-বাবার আদরে স্কুলে যায়, সেই বয়সে আমি সমাজ আর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথে নেমেছিলাম। হ্যাঁ, আমি সেই মানুষ, যে বছরের পর বছর রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে হাত পেতেছি, ভিক্ষাবৃত্তি করে পেটের ক্ষুধা মিটিয়েছি। আমাদের এই অবহেলিত জনগোষ্ঠী কি আজীবন অভিশপ্ত আর অস্পৃশ্য হয়েই থাকবে? সেই থেকেই আমি পথে পথে ভিক্ষা করা ছেড়ে মানুষের দরজায় দরজায় গিয়েছি। তাদের সুখ দুঃখের কথা শুনেছি। চেষ্টা করেছি তাদের পাশে থাকার।
মুন্নি বলেন, দেওয়ানগঞ্জের তেইশ হাজার সাতশত আটষট্টি জন মানুষ যখন আমাকে ভোট দিয়ে জয়ী করল, সেদিন পুরো বিশ্ব দেখেছিল এক নতুন ইতিহাস। আমার সেই জয় কোনো রাজনৈতিক দয়া ছিল না, সেটি ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আমার এই সাফল্য দেখে বাংলাদেশের হাজার হাজার হিজড়া ভাই-বোনেরা ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে কর্মসংস্থানের পথে আসবে, তারাও মানুষের সেবায় এগিয়ে আসবে। আমি চেয়েছিলাম তাদের কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে, যাতে তারা আর সমাজের বোঝা না হয়। কিন্তু আজ অত্যন্ত বেদনার সাথে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে, আর সেই ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল আমার তেইশ হাজার ভোটারের স্বপ্ন। রাষ্ট্র যেখানে আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার কথা, যেখানে আমাদের সুরক্ষা দেয়ার কথা, সেই রাষ্ট্রই আজ এক কলমের খোঁচায় আমার অর্জিত সম্মান এবং জনগণের পবিত্র আমানত কেড়ে নিলো। রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে আমার বিনম্র জিজ্ঞাসা-আপনারা কি আমাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করেন না? জনগণের রায় যেখানে আমাকে সম্মানের আসনে বসালো, রাষ্ট্রের এক প্রশাসনিক আদেশে সেই রায়কে কেন ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হলো?
তিনি বলেন, আমি আর সেই অন্ধকারে ফিরে যেতে চাই না। আমি মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই, মানুষের সেবা করেই মরতে চাই। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হোক, কিন্তু জনগণের সরাসরি ভোটে পাওয়া অধিকার কেন কেড়ে নেয়া হবে? আমি রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে বিচার চাই, আমি সাধারণ মানুষের কাছে বিচার চাই। আমাকে আমার অধিকার ফিরিয়ে দিন, আমাকে তেইশ হাজার মানুষের আমানত রক্ষা করার সুযোগ দিন।