গোধূলী লগ্নে টেস্ট ক্রিকেট

Printed Edition

জসিম উদ্দিন রানা

ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য, আসল পরীক্ষা, সব কিছুই লুকিয়ে আছে টেস্টে। অথচ দিন দিন কমছে টেস্ট খেলোয়াড়, কমছে আগ্রহ, কমছে আয়োজন। বাংলাদেশে টেস্ট যেন এখন দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা। বছরে হাতেগোনা কয়েকটি ম্যাচ, তাও কখনো পূর্ণ শক্তির দল নয়, কখনো প্রস্তুতির অভাব। প্রশ্ন উঠছে, এভাবে কি টেস্টের ভিত শক্ত হবে?

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বারবার টি-২০ আর ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ঝলকানিতে ব্যস্ত। আর্থিক লাভ, সম্প্রচার চুক্তি, দর্শক সব কিছুর কেন্দ্র এখন স্বল্প সময়ের ক্রিকেট। কিন্তু দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটের জন্য যে ধৈর্য, পরিকল্পনা আর ধারাবাহিকতা দরকার, তার ছিটেফোঁটাও কি দেখা যাচ্ছে? বোর্ড কর্তারাও এ বিষয়ে প্রায় নীরব। টেস্ট ক্যালেন্ডার অনিয়মিত, ঘরোয়া চার দিনের লিগে নেই প্রতিযোগিতার তীব্রতা। এবার তো সেটিকে ওয়ানডেতে নিয়ে আসা হয়েছে।

ফলে পুরনোদের বাদ দিলে নতুনদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেই সম্ভাবনা। টেস্ট মানে কেবল টেকনিক নয়, মানসিক দৃঢ়তা, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, পাঁচ দিন লড়াই করার সামর্থ্য। এসব গড়ে ওঠে নিয়মিত ম্যাচ আর সঠিক পরিকল্পনায়। কিন্তু যখন টেস্টই হবে না, তখন খেলোয়াড় তৈরি হবে কিভাবে?

ক্রিকেটের সবচেয়ে আভিজাত্যপূর্ণ সংস্করণ টেস্ট। সাদা পোশাকে পাঁচ দিনের লড়াই, ধৈর্য আর শুদ্ধতার পরীক্ষা- অনেক তরুণ ক্রিকেটারের স্বপ্নের চূড়া। কিন্তু সেই স্বপ্নই যদি একসময় সীমাবদ্ধতার প্রতীকে পরিণত হয়? যদি ‘টেস্ট ক্রিকেটার’ পরিচয়টা গর্বের বদলে সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়? বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে এক দিন আগেই ম্যাচ শেষে এমনই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার। বিষয়টি সামনে আনেন মুমিনুল হক। ব্যাট হাতে ৮২ বলে ৮৩ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলেও দলকে জেতাতে পারেননি। লাল বলের ক্রিকেটে ৭৫ টেস্ট খেলা এই অভিজ্ঞ ব্যাটার পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশে শুধু ‘টেস্ট ক্রিকেটার’ হয়ে থাকা কোনো ইতিবাচক উদাহরণ নয়।

মুমিনুল বলেন, ‘আমাকে যদি বলেন যে টেস্ট প্লেয়ারদের জন্য কী বলবেন? আমি তো বলব কোনো মানুষের টেস্ট ক্রিকেটার হওয়া উচিত না। কারণ, আপনি সাদা বলে কোনো ম্যাচ খেলতে পারছেন না। আমার কাছে এটা একটা বাজে উদাহরণ।’

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১৬১ ও লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ১৭৯ ম্যাচ খেলা মুমিনুল মনে করেন, দেশে এমন পরিবেশ নেই যেখানে একজন ক্রিকেটার কেবল লাল বল খেলে টিকে থাকতে পারবেন। সাদা বলের নিয়মিত টুর্নামেন্ট, আর্থিক নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ না থাকলে তরুণদের কাছে টেস্ট ক্রিকেটের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাবে।

মুমিনুলের ভাষায়, ‘ছোটবেলায় যেমন আপনারা সবাই বলেন যে সবার একটা স্বপ্ন থাকে টেস্ট খেলার। সেই টেস্ট খেলার স্বপ্ন কারও থাকবে না তখন। সাদমান নামে এক ক্রিকেটার বা মুমিনুল নামে এক ক্রিকেটার যারা শুধু লাল বল খেলতে পারে। তাও পাঁচ মাস পর। আর সাদা বলে এখানে কোনো টুর্নামেন্টে অথবা বিপিএল হোক, কোনো টুর্নামেন্টে সে খেলতে পারে না। দিন শেষে তো আপনার আর্থিক ব্যাপারটা তো চলেই আসে। এসব জিনিস হলে তখন টেস্ট ক্রিকেটার বের হওয়ার সুযোগ নেই।’

আজ যারা সাদা পোশাক পরে নামছে, তারা অনেকেই প্রস্তুতির চেয়ে পরিস্থিতির শিকার। টেস্টকে গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এ সংস্করণ শুধু ইতিহাসের গল্প হয়ে যাবে। ক্রিকেট যদি সত্যিই সৌন্দর্যের খেলা হয়, তবে সেই সৌন্দর্য রক্ষার দায় সবার আগে বোর্ডের। এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে, এক দিন হয়তো টেস্টে বাংলাদেশ থাকবে কাগজে-কলমে।