বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬
ফুয়েন্তে : বদলে যাওয়া স্পেনের নেপথ্য নায়ক
Printed Edition
স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সফল কোচ ভিসেন্তে দেল ভস্ক। তার অধীনেই ২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয় করা এই ফুটবল-পাগল দেশটির। দ্য বসখ্যাত এই কোচের পর আরো কয়েকজন দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কাতার বিশ্বকাপে হেড কোচ ছিলেন বর্তমান পিএসজির সফলতম কোচ লুইস এনরিক। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের পর স্পেন আর ফাইনালে কেন, সেমিফাইনালেও খেলতে ব্যর্থ হয়েছে।
অথচ সেই স্পেন এখন মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বিশ্বকাপের ফাইনালে। বিশ্বকাপের আগে তাদের ভাণ্ডারে ইউরো এবং ইউরো ন্যাশন্স লিগের শিরোপা। জাভি, ইনিয়েস্তা, পিউল, জেরার্ড পিকেদের যুগের পর ফের স্পেন ইউরোর সেরা দলে পরিণত। অন্য দিকে ১৬ বছর পর ফের ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশটি বিশ্বকাপের ফাইনালে। বিশ্বখ্যাত বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবের দেশ স্পেনের এই ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্য কারিগর একজন। তিনি কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে কাস্টিলো।
এই কোচের অধীনে ইউরো এবং বিশ্বকাপ মিলে টানা অপরাজিত স্পেন। ইউরো ২০২৪-এ সাত ম্যাচে অপরাজিত থাকা দলটি এবার বিশ্বকাপে ম্যাচে হারেনি। এ পর্যন্ত সাত ম্যাচে অপরাজিত স্পেন এখন আরেকটি এবং সবচেয়ে বড় ট্রফি জয়ের দ্বারপ্রান্তে। ইউরোর কঠিন গ্রুপে পড়েছিল ফুয়েন্তের স্পেন। কিন্তু ঠিকই ক্রোয়েশিয়া, ইতালি এবং আলবেনিয়াকে হারিয়ে তাদের গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে আসা। এরপর নকআউটে একে একে জর্জিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে পরাজয়ের লজ্জা দিয়ে শিরোপা জিতেছে।
অবশ্য এবারের বিশ্বকাপে শুরুটা ভালো হয়নি তাদের। ঠিক ২০১০ সালের মতো। ২০১০-এর বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরেছিল তারা। এরপর একে একে হন্ডুরাস, চিলি, পর্তুগাল, প্যারাগুয়ে, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জয়। অন্য দিকে এবার প্রথম খেলাতেই বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া অখ্যাত কেপ ভার্দের সাথে হতাশাজনক ড্র দিয়ে শুরু। পরে অবশ্য ভিন্ন চেহারায় দেখা যায় তাদের। একে একে সৌদি আরব, উরুগুয়ে, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনাল পর্যন্ত এসেছে।
স্পেন দলটি বিশ্ব ফুটবলে রেকর্ড গড়ে টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত। এ ছাড়া ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলে ১৪ ম্যাচের ১৩টিতে জিতেছে এবং একটি ম্যাচে ড্র করেছে। দে লা ফুয়েন্তে হলেন ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে অপরাজিত থাকা কোচ। তিনি স্পেনে যুব দল এবং অনূর্ধ্ব-২৩ অলিম্পিক দলের কোচ ছিলেন। ৬৫ বছর বয়সী সাবেক এই লেফট ব্যাক দানি ওলমো, মিকেল মেরিনো, মিকেল ওয়ারজাবাল, ফাবিয়ান রুইজ, উনাই সিমনদের নিয়ে ইউরো অনূর্ধ্ব-২১ ফুটবলে শিরোপা জিতেছেন। ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে রৌপ্য জিতিয়েছেন। অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপেও শিরোপা জয় করেছেন। যেহেতু তিনি যুব ফুটবল দলের কোচ সিনিয়র জাতীয় দলে দানি ওলমো, মিকেল মেরিনো, মিকেল ওয়ারজাবাল, ফাবিয়ান রুইজ, উনাই সিমনের ওপরই আস্থা রেখেছেন এই বিশ্বকাপেও। এরাই এখন সিনিয়র বিশ্বকাপ জয় করা থেকে এক ম্যাচ দূরে।
কাতার বিশ্বকাপে ব্যর্থ হওয়ার পর লুইস এনরিক পদত্যাগ করেন। এর পরপরই ২০২২ সালের ডিসেম্বরে স্পেন জাতীয় দলকে টেনে নেয়ার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় ফুয়েন্তেকে। তিনি জাতীয় দলে একজন স্পেশালিস্ট স্ট্রাইকার রাখার পক্ষে এবং দুই উইং থেকে বিপক্ষ বক্সে বেশি বেশি ক্রস ফেলা যায় সেই দর্শনে বিশ্বাসী। ইউরো জেতার আগেই ফুয়েন্তের স্পেন উয়েফা ন্যাশন্স লিগে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এখন বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে ট্রফি জয়ের হ্যাটট্রিক হবে তাদের।
খেলা শেষে স্পেনের কোচ এই জয়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে আমার মনে হয়, অসাধারণ সব খেলোয়াড়ের এই দলটিকে পরিচালনা করার বিষয়টি অনেক আনন্দ ও গর্বের মিশ্রণ, যেমনটা আমি সবসময়ই বলে থাকি।’
এরপর যোগ করেন, ‘আমরা এভাবেই এগিয়ে যেতে চাই এবং নিজেদের আরো উন্নত করতে চাই; আমাদের সামনে এখনো একটি ধাপ বাকি এবং আমরা সেই লক্ষ্যেই ঝাঁপিয়ে পড়ব। বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার পেছনে অনেক মানসিক চাপ ও বিশাল দায়িত্ববোধ জড়িয়ে থাকে। এখানে আসতে পারাটা এক বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয় এবং এই পুরো অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে অনুভব করা প্রয়োজন।
তার মতে, ‘প্রায় চার বছর আগে যখন আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, তখন আমাদের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা দর্শন ছিল। আমরা সেই দর্শনের প্রতি অবিচল থেকেছি এবং তা-ই আমাদের আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমি আবার বলছি, আমি সত্যিই গর্বিত।’