সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশ

হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে শহীদ মিনারে ঐক্যের আহ্বান

Printed Edition
back-2
শহীদ মিনারে ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মাহমুদুর রহমান : নয়া দিগন্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিচারের দাবি তুলেছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও দল-মতের মানুষ।

গতকাল সোমবার বিকেলে ইনকিলাব মঞ্চের আয়োজনে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশে অংশ নেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় যুবশক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা।

সমাবেশস্থলে উপস্থিত নেতাকর্মীরা শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানান। এ সময় ‘আমরা সবাই হাদি হবো’, ‘এক হাদির রক্তে জন্ম নেবে লক্ষ হাদি’সহ নানা প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহীদ মিনার। সমাবেশে বক্তারা হামলার বিচারের দাবির পাশাপাশি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ঐকমত্য পোষণ করেন।

সমাবেশ শুরুর আগে মঞ্চে গান ও কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করা হয়। পরিবেশনাগুলোতে সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য তুলে ধরা হয় এবং শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, হাদির ওপর আক্রমণের আগে থেকেই সে বলছিল, ‘আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’ কথাগুলো সোস্যাল মিডিয়ায় ইন্টেলিজেন্সের সবাই জানার পরও তার নিরাপত্তায় গোয়েন্দা সংস্থা কী ব্যবস্থা নিয়েছে? এই ইন্টেলিজেন্স ফেইলিউরের জন্য সরকারকে জবাব দিতে হবে। তিনি বলেন, হাদির ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একটা প্যাকেজ প্রোগ্রাম। আমি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে রোববার বলেছিলাম, ডিজিএফআই, ডিবি, এসবি, এনএসআই হাজার হাজার কোটি টাকা বেতন নেয়। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আপনারা জনগণের নিরাপত্তায় একটি গোয়েন্দা তথ্য দিয়েও সহায়তা করতে পারেননি।

প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে এই জামায়াত নেতা বলেন, আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটল। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা ছিলাম তাদের ওপর আক্রমণ হলো। আপনি বারবার জাতীয় ঐক্য অটুট রাখতে বলেন, সেটা তো আমরা করছি। আমরা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু আপনার সরকার ফ্যাসিবাদের অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ভারতীয় আধিপত্যবাদের সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ হাসিনাকে যারা আশ্রয় দিয়েছে, হাদির ওপর গুলি করা ব্যক্তিকে যারা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, তারা বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে দেবে না। কিন্তু নির্বাচন বানচাল করে এ দেশকে ভারতের কলোনি বানাতে দিতে আমরা রাজি নই। তিনি বলেন, টকশোতে সুশীলরা, বুদ্ধিজীবীরা করপোরেট হাউজে বসে যে ন্যারেটিভ হাদির দিকে টার্গেট করলেন, সেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আজকের এ জনসভা। আজ গোটা জাতি প্রতিরোধের আওয়াজ তুলেছে।

আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অন্য দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসে মদদ দেয়া যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “অবিলম্বে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের বিরুদ্ধে নালিশ উত্থাপন করতে হবে।” তিনি বলেন, হাদির ওপর হামলার সাথে জড়িত সব পরিকল্পনাকারী, মদদদাতা ও সহযোগীদের দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, হাদির ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্য যদি এমন মন্তব্য করেন, তাহলে তার পদে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার থাকে না। তার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কি না- এই প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই তোলা হচ্ছে। অবিলম্বে ওই মন্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা এখানে কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে আসিনি। আমরা এসেছি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কর্মী হিসেবে। বাংলাদেশ আজ আক্রান্ত হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে নৈতিকভাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকার কোনো অধিকার নেই। তাই তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে।’ নাহিদ বলেন, ‘৫ আগস্টের পরও দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীদের টার্গেট করা হয়েছে, শহীদ পরিবারগুলো হয়রানির শিকার হয়েছে এবং মামলাবাণিজ্য চলেছে। বিচার হয়নি ঠিকভাবে, অথচ আইন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টারা পদে বহাল থেকেছেন।’ তিনি বলেন, গত ১৬ বছর ধরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিরোধী দল দমনে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ ৫ আগস্টের পর সেই দক্ষতা যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। এখন তারা খুনিকে সীমান্ত পার হতে দেয়, ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও গ্রেফতার করতে পারে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, “খুবই সঙ্কটময় পরিস্থিতি সামনে। একটি লাশ পড়লে আমরাও লাশ নেব। অনেক ধৈর্য ধরা হয়েছে, আর না। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়ে ভাইদের ওপর হামলা করবেন- এটা আমরা বরদাশত করব না।” তিনি আরো বলেন, অভ্যুত্থানের পর লড়াইয়ে পরাস্ত হয়েছি বলেই হাদি গুলিবিদ্ধ- এমন মন্তব্য করা হচ্ছে। কিন্তু এই লড়াই দীর্ঘ। এজন্য শুরু থেকেই বলেছি মুজিববাদের মূল উৎখাত করতে হবে। সেই চেষ্টা খুব কমই দেখা গেছে। এখনো মুজিববাদবিরোধী লড়াইয়ে আমরা পিছিয়ে আছি।

বাংলাদেশে থেকেই দেশের বিরুদ্ধে অপতৎপরতা চালানো একটি গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করে মাহফুজ আলম বলেন, “৫ আগস্টের পর আমরা চাইলে এদের সব ধ্বংস করে দিতে পারতাম, করিনি। আমরা ক্ষমা করেছি। কিন্তু যদি সেই ক্ষমা ভুল হয়ে থাকে, তবে আজ আমরা প্রতিজ্ঞা করছি আর ক্ষমা করব না।” তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা নিরাপদ না থাকলে, এ দেশে আমাদের শত্রুরাও নিরাপদ থাকতে পারবে না। জুলাই শক্তি গঠনমূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে সব লড়াই রুখে দেয়া সম্ভব।

এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, যারা দিল্লির তাঁবেদারি করছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই আমরা তৃতীয় স্বাধীনতা অর্জন করব। তিনি নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচনা করেন এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতার অভাব তুলে ধরেন।

এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, গণহত্যাকারীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কোনোদিন স্বাভাবিক হতে পারে না।

এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ১৬ বছর ধরে ভারতের সমর্থনে দেশে ফ্যাসিবাদী পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণহত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের ভারতে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। তিনি ভারতের কাছে গণহত্যাকারীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানান এবং হাদির দ্রুত সুস্থতা কামনা করে দোয়ার আহ্বান জানান।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশের ভেতরে কারা দিল্লির ‘অ্যাসেট’ হিসেবে কাজ করছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র চলছে এবং হাদির ওপর হামলার পর পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। তিনি গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ফ্যাসিবাদ নির্মূলে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার হওয়া অনেক সন্ত্রাসীকে মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যার ফলে আবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়ছে। তিনি অবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সরাসরি অভিযান পরিচালনার দাবি জানান এবং বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জনগণ আবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে।

ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ওসমান ভাই আমাদের পাশে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। তিনি হয়তো সামনে থেকে আর আগের মতো কর্মসূচিতে থাকতে পারবেন না, কিন্তু ইনকিলাব মঞ্চের কণ্ঠ আমাদের মাধ্যমেই উচ্চারিত হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একজন নির্বাচন কমিশনের সদস্য কিভাবে বিতর্কিত মন্তব্য করেন এবং এখনো পদে বহাল থাকেন- এ বিষয়ে জাতির কাছে জবাব দিতে হবে।