ঐতিহ্যের গাউছিয়ায় উপচে পড়া ভিড়

রাজধানীর ঈদ বাজার

Printed Edition
back-2
ঐতিহ্যের গাউছিয়ায় উপচে পড়া ভিড়

হাবিবুল বাশার

রাজধানীর অন্যতম পুরনো ও বহুল পরিচিত মার্কেট নিউমার্কেট এলাকায় গাউছিয়া মার্কেট। কয়েক দশক ধরে এটি কেবল একটি কেনাকাটার কেন্দ্র নয়, বরং সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ঈদ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এই ঐতিহাসিক মার্কেটের প্রতিটি অলিগলি এখন ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। শুরুর দিকে কেনাকাটার গতি কিছুটা মন্থর থাকলেও, ঈদের আগ মুহূর্তে বর্তমান চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন।

গাউছিয়া মার্কেটের ইতিহাস বেশ পুরনো। ব্রিটিশ আমল-পরবর্তী এবং পাকিস্তান আমলের মাঝামাঝি সময়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত তরিকতভিত্তিক একটি নাম থেকে এই মার্কেটের নামকরণ করা হয়েছে। এক সময় কেবল খুচরা কাপড়ের জন্য পরিচিতি থাকলেও, সময়ের বিবর্তনে নারীদের পোশাকের জন্য এটি রাজধানীর অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সুলভ মূল্যে ভালো মানের পোশাক পাওয়ার জন্য ঢাকার নারীদের কাছে ‘গাউছিয়া’ নামটি প্রথম পছন্দ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

সব বয়সের মানুষের ভিড়

বিশেষ করে নারী ও তরুণীদের ভিড় এখানে সবচেয়ে বেশি। নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ, সবার জন্যই এখানে পোশাকের সমাহার রয়েছে। তবে স্কুল ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং গৃহিণীদের আনাগোনা এখানে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

বর্তমান বাজারের পোশাক কালেকশন

এবারের ঈদে গাউছিয়া মার্কেটে দেশী ও বিদেশী পোশাকের এক বিশাল সম্ভার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে এখানে পাওয়া যাচ্ছে:

দেশী পোশাক : টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি, জামদানি এবং ব্লক-বাটিকের থ্রি-পিস।

বিদেশী পোশাক : ভারতীয় কাশ্মীরি সিল্ক, কাঞ্জিভরাম স্টাইল শাড়ি এবং পাকিস্তানি নামী ব্র্যান্ডের লন ও অরগানজা ড্রেস।

ডিজাইন ট্রেন্ড : বর্তমানে নেটের ওপর ভারী কাজের কামিজ, আলিয়া কাট ও সায়রা কাট ড্রেসগুলো তরুণীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়। এ ছাড়া রেডিমেড কুর্তি ও গাউনের এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে প্রতিটি দোকানে।

নারীদের পোশাক : শাড়ি এবং আনস্টিচ থ্রি-পিসের দোকানে তিল ধারণের জায়গা নেই। বিক্রেতারা জানান, সাশ্রয়ী দামের কারণে অধিকাংশ নারীই এখান থেকে ঈদ কালেকশন কিনছেন।

শিশুদের পোশাক : শিশুদের জন্য রয়েছে রকমারি ফ্রক, লেহেঙ্গা এবং বাহারি টু-পিস। ছেলেদের জন্য সুতি পাঞ্জাবি ও জিন্স প্যান্টের পসরা সাজানো হয়েছে। বিক্রেতাদের মতে, বড়দের তুলনায় ছোটদের পোশাকের বিক্রি এবার অনেক বেশি সন্তোষজনক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মার্কেটের প্রতিটি তলায় তিল ধারণের জায়গা নেই। পরিবার নিয়ে আসা ক্রেতারা ভিড়ের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন।

একজন ক্রেতা বলেন, ‘বেশ কিছুক্ষণ আগে এসেছি কিন্তু অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এখনো কিছুই কিনতে পারিনি। সাথে আমার বড় ভাই এবং আম্মু আছেন, কিন্তু দোকানের সামনে দাঁড়ানোই দায় হয়ে পড়েছে।’

অন্যদিকে একজন অসুস্থ ক্রেতা তার এক বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে মার্কেটে এসে চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রচণ্ড ভিড় আর গরমে শিশুটি অনবরত কান্নাকাটি শুরু করায় তিনি কেনাকাটা না করেই ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সপরিবারে কেনাকাটা করতে আসা এক নারী জানান, ‘স্বামী আর তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাচ্চাদের কান্নাকাটির কারণে এখন পর্যন্ত একটি কাপড়ও কিনতে পারিনি। দু-একটা দোকানে কথা বললেও ভিড়ের চাপে স্থির হওয়া যাচ্ছে না।’

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি

মার্কেটে দেশী জামদানি, টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি থেকে শুরু করে ভারতীয় সিল্ক ও পাকিস্তানি লন, সবই পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

তুষার বস্ত্র বিতানের মালিক বলেন, ‘বর্তমানে বেচাকেনার ভিড় বেশ ভালো। তবে ঈদের আগের এই বিশেষ ‘পিক’ সময়টা যদি আরও কয়েক দিন আগে থেকে শুরু হতো, তবে হয়তো বেচাকেনা আরো ভালো হতো। এখন মূলত শুক্র ও শনিবার প্রচণ্ড চাপ থাকে, সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে আগের মতো প্রতিদিন সমান চাপ দেখা যাচ্ছে না।’

নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশি তৎপরতা

ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিউমার্কেট থানা সংলগ্ন এলাকা ও আশপাশের মার্কেটগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। স্থাপিত হয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প।

কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার মাহমুদুল আলম জানান, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি মার্কেটে আমাদের ৩ জন করে পুলিশ অফিসার নিয়োজিত আছেন। এ ছাড়া অস্থায়ী ক্যাম্পে সব সময় ৮-১০ জন সদস্য প্রস্তুত থাকেন যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত মুভ করা যায়। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর বা আপত্তিকর ঘটনা ঘটেনি।’

গাউছিয়া মার্কেটে এখন বৈচিত্র্যময় পোশাকের পাহাড় থাকলেও ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে যেমন শিশুদের পোশাক ও নারীদের শাড়ি-কামিজের ধুম কেনাকাটা চলছে, অন্যদিকে ভিড়ের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের ভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে।