ক্রীড়াঙ্গনে নতুন বিতর্ক : অ্যাডহক নাকি নির্বাচন
Printed Edition
জসিম উদ্দিন রানা
তিন মাসের জন্য গঠিত অ্যাডহক কমিটি চলছে দেড় বছর ধরে! নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই, স্পষ্ট জবাবদিহি নেই-দেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো চলছে যেন অনির্দিষ্ট সময়ের লাইসেন্স নিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সার্চ কমিটির সুপারিশে ৪৯টি ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনে বসানো হয়েছিল অ্যাডহক কমিটি। সেই অস্থায়ী কাঠামোই এখন স্থায়ী রূপ নেয়ার পথে। এমন অভিযোগ উঠছে ক্রীড়া অঙ্গনে।
এরই মধ্যে বইছে নির্বাচনের হাওয়া। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, গোড়া থেকে শুরু হবে নির্বাচন। আগে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থায় ভোট, তার পর জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিন মাসের মধ্যেই তৃণমূল থেকে ফেডারেশন পর্যন্ত স্বচ্ছ নির্বাচন সম্পন্ন করতে চান তারা।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এটাই কি স্বচ্ছতার একমাত্র পথ? ক্রীড়া সংগঠকদের একাংশ বলছেন, উল্টোটা হওয়া উচিত। তাদের যুক্তি, জাতীয় ফেডারেশনগুলোর বর্তমান অ্যাডহক কমিটি বহাল রেখে তৃণমূলে নির্বাচন দিলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থেকেই যায়। উপজেলা-জেলা-বিভাগীয় সংস্থায় যারা ভোটার, তাদের ওপর ফেডারেশন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অদৃশ্য চাপ থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ফলে নির্বাচন হলেও তা কতটা নিরপেক্ষ হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ক্রীড়া সংগঠক দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য আরো স্পষ্ট, আগে জাতীয় ফেডারেশনগুলোতে নতুন অ্যাডহক কমিটি বসাতে হবে, যারা তৃণমূলের নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারবে না। তার পর উপজেলা, জেলা ও বিভাগে ভোট হলে সেটি হবে তুলনামূলক স্বচ্ছ; অন্যথায় পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই বিতর্ক থেকে যাবে।
এ দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সার্চ কমিটির আহ্বায়ক জোবায়দুর রহমান রানা পরে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত মহাসচিব হন। বিভাগীয় সংস্থা ও ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের ভোটেই গঠিত হয়েছে বিওএ’র বর্তমান নির্বাহী কমিটি। এখন যদি এসব সংস্থায় নতুন নির্বাচন হয়, নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তাতে প্রশ্ন উঠছে, নতুন নেতৃত্ব কি বিওএ’র সাথে সমন্বয়ে চলবে, নাকি তৈরি হবে নতুন দ্বন্দ্ব?
তবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) মো: আমিনুল এহসান এতটা উদ্বিগ্ন নন। তার দাবি, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকবে না; সব কিছু নজরদারিতে রাখা হবে।
তবু বাস্তবতা বলছে, ক্রীড়াঙ্গন এখন এক সন্ধিক্ষণে। স্বচ্ছতার নামে যদি পুরনো প্রভাবই বহাল থাকে, তবে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। আর যদি সত্যিই পরিবর্তনের সাহসী সিদ্ধান্ত আসে, তবেই হয়তো দীর্ঘদিনের অ্যাডহক নির্ভরতা কাটিয়ে গণতান্ত্রিক ক্রীড়া প্রশাসনের পথে হাঁটবে দেশ। এখন দেখার বিষয় সরকার কোন পথে হাঁটে, ফের অ্যাডহক, নাকি সরাসরি নির্ভেজাল নির্বাচন।
কেমন ক্রীড়াঙ্গন চান তারা
ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা নতুন সরকারের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন, তারা চান রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পরিকল্পনাভিত্তিক ও পেশাদার ক্রীড়া প্রশাসন। বিওএ মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান ক্রীড়াঙ্গনে ইতিবাচক পরিবেশ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিলেন। ‘নতুন সরকারের কাছে চাওয়ার কমতি নেই। তবে ক্রীড়াঙ্গনের মানুষদের চাওয়া এটিই, সামনের দিকে খেলাধুলা আরো ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ক্রীড়াবান্ধব কমিটি আসবে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা, বিভাগ, ফেডারেশনের নির্বাচন যেনো সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হয়।’
বাফুফে সহসভাপতি ফাহাদ করিম জানিয়েছেন, ‘বেশি চাওয়া নেই সরকারের কাছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন, ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং টেকনিক্যাল টিমে ইনভেস্টমেন্ট ওয়ালা ক্রীড়াঙ্গন চাই। মাঠ চাই, খেলার জায়গা চাই, স্টেডিয়াম চাই, স্কুল লেভেল থেকে খেলা ওরিয়েন্টেশন চাই।’
হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব:) রিয়াজুল হাসান বলেন, খেলোয়াড়রা যেন সুবিধা পায়। তারা যেনো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে।
হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদের কথা, খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের প্রতিও বাড়তি নজর দিবে নতুন সরকার। পাঁচ বছরের একটা পরিকল্পনা থাকবে, কোথায় যেতে চাই। ভলিবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বিমল ঘোষের কথা, নতুন সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া থাকবে যে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে ভালো লোককে ফেডারেশনগুলোতে দায়িত্ব দেয়া হয়। নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে খেলাধুলার প্রতি।