শান্তি ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব ইরানের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

শান্তি ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস অ্যাক্সিওসের বরাত দিয়ে গালফ নিউজ জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শেষ করা এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে।

জানা গেছে, সর্বশেষ প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা-পরবর্তী পর্যায়ে স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইরানের নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং পরবর্তীতে ইরান এবং লেবাননে আর আগ্রাসী হামলা হবে না- এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে।

দ্বিতীয় পর্যায় : যদি প্রথম স্তরের দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মেনে নেয়, তাহলে দ্বিতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী পরিচালনা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আলোচনা চলবে।

তৃতীয় পর্যায় : যদি প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের সাথে এই যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ মীমাংসায় পৌঁছায়, তখন ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।

ইরানের নতুন প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া জানতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দফতর হোয়াইট হাউজে যোগাযোগ করেছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস অ্যাক্সিওস বলেছেন, ‘এসব খুবই সংবেদনশীর কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় এবং যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে না। আমাদের প্রেসিডেন্ট যেমনটা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো কার্ড আছে এবং আমরা কেবল এমন একটি চুক্তিতেই রাজি হবো- যা মার্কিন জনগণকে অগ্রাধিকার দেবে এবং ইরানকে কখনো পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবে না।

ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে একটি স্থায়ী সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেছিলেন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা। কিন্তু ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও সেই বৈঠক ব্যর্থ হয় এবং প্রতিনিধিরা কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না করেই ফিরে যান।

প্রথম দফা সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দ্বিতীয় দফা সংলাপে আসার আমন্ত্রণ জানায় পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ। ১১ এপ্রিলের ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাকচি গত কয়েক দিনে একাধিকবার পাকিস্তান সফরে গেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিতীয়বার সরাসরি সংলাপে বসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইরানের এই প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনিও তার প্রতিনিধি দলকে ফের ‘১৮ ঘণ্টার ফ্লাইটে’ পাঠাতে আগ্রহী নন এবং এখন থেকে ফোনকলে যাবতীয় আলাপ-আলোচনা হবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরেই নতুন প্রস্তাবটি দিয়েছে ইরান। গত রোববার এক সংক্ষিপ্ত সফরে পাকিস্তান এসেছিলেন আরাকচি, তার আগে তিনি গিয়েছিলেন হরমুজ প্রণালীর অপর তীরের দেশ ওমানে। পাকিস্তানে সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে রাশিয়া গিয়েছেন আরাকচি।

গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনসহ শীর্ষস্থানীয় রুশ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সফরকালে তিনি জানান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তেহরান ও মস্কোর ঘনিষ্ঠ পরামর্শ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাই তার মূল লক্ষ্য। আরাকচি মনে করেন বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সাথে এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে তার বৈঠকটি চলমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এই সঙ্কটময় মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় ও পারস্পরিক পরামর্শ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সমর্থন ও রাজনৈতিক অবস্থান তেহরানের জন্য বড় একটি শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, আরাকচির এই সফর কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পশ্চিমা শক্তিগুলোর ওপর একটি কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল। ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বর্তমান বৈশ্বিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আরাকচি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, এই আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছতে সক্ষম হবে যা যুদ্ধের পরবর্তী ধাপগুলোতে ইরানের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। সেন্ট পিটার্সবার্গে এই বৈঠকের ফলাফলের দিকে এখন পুরো বিশ্বের কূটনৈতিক মহল গভীর নজর রাখছে। পুতিনের সাথে এই বৈঠকের মাধ্যমে ইরান মূলত রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালো কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করতে চাইছে। যেহেতু ইরান বর্তমানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই ক্রেমলিনের সাথে এই সমন্বয় তেহরানকে নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে বা যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে। আরাগচি তার বক্তব্যে বারবার এই সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং একে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তেহরানের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ‘কার্ড’ অব্যবহৃত : গালিবাফ

তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। তিনি দাবি করেছেন, ওয়াশিংটনের আধিপত্যের ধারণা বাস্তবসম্মত নয় এবং তেহরানের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ‘কার্ড’ অব্যবহৃত রয়েছে। গত রোববার রাতে সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। সেখানে তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কৌশলকে একটি সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন।

গালিবাফের মতে, ইরানের শক্তির মূল ভিত্তি সরবরাহভিত্তিক- যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, বাবুল-মান্দেব প্রণালী এবং তেলের পাইপলাইন নেটওয়ার্ক। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করছে চাহিদাভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর, যেমন- কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়, চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য মূল্য সমন্বয়।

তিনি বলেন, তেহরানের হাতে এখনো এমন কিছু বিকল্প রয়েছে যা এখনো প্রয়োগ করা হয়নি। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তার বেশ কিছু অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করেছে বা আংশিকভাবে প্রয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে তিনি মন্তব্য করেন, ‘তারা কার্ড নিয়ে বড়াই করছে- দেখা যাক, সরবরাহ কার্ড বনাম চাহিদা কার্ড।’ ইরানের সম্ভাব্য কৌশল প্রসঙ্গে গালিবাফ জানান, হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তবে বাবুল-মান্দেব প্রণালী এবং পাইপলাইন সংক্রান্ত বিকল্প এখনো প্রয়োগ করা হয়নি। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়া হয়েছে, চাহিদা নিয়ন্ত্রণ আংশিকভাবে কার্যকর হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো মূল্য সমন্বয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার দিক তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে দেশটিতে জ্বালানির চাহিদা বাড়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে হুমকি

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো যাতে ওয়াশিংটনকে সমর্থন না দেয় সে জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, তাদের তেলকূপসহ কোনো অবকাঠামো হামলার নিশানা হলে হামলাকারীদের সমর্থক উপসাগরীয় দেশগুলোতে ‘চার গুণ’ পাল্টা আঘাত হানা হবে।

হরমুজ প্রণালীতে চলমান নৌ-অবরোধের মধ্যে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাকাব ইসফাহানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে এই হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘যেকোনো ধরনের আগ্রাসী আচরণের জবাব দেয়া হবে। অবরোধের কারণে আমাদের তেলকূপসহ কোনো অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে, আগ্রাসনকারীকে সমর্থন দেয়া দেশগুলোতে একই পরিকাঠামোয় চার গুণ হামলা চালিয়ে আমরা সমপরিমাণ ক্ষতি নিশ্চিত করব।’

ইসফাহানি আরও বলেন, ‘আমাদের অংক কষার পদ্ধতিটা আলাদা। যদি আমাদের একটি তেল শোধনাগারে হামলা হয়, আমরা চারটি তেল শোধনাগারে হামলা চালাব।’ এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের ওপর তেহরান কী পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে চায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই ইরানের এই কঠোর প্রতিক্রিয়া এলো।

ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ক্রমাগত চাপের ফলে ইরানের তেল মজুদ বা ট্যাংকারে স্থানান্তরের সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। গত সপ্তাহে নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়ছে! তারা এখনই হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে চায়, কারণ, তারা অর্থের জন্য হাহাকার করছে! প্রতিদিন তাদের ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে। সামরিক ও পুলিশ বাহিনী বেতন না পেয়ে অভিযোগ করছে।’

পরবর্তীতে ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, এ ধরনের সীমাবদ্ধতা চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের তেলের পাইপলাইনগুলো অকেজো হয়ে পড়তে পারে। ওয়াশিংটনের এই ‘চাপ প্রয়োগের কৌশল’ এখন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।

ট্রাম্পের এই কথার জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে তেহরানের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। এক্স-এ দেয়া এক পোস্টে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত করার সামর্থ্য ইরানের রয়েছে।

তেহরানের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছৃ ‘কার্ড’ আছে বোঝাতে তিনি একটি সমীকরণ ব্যবহার করে লেখেন : ‘সরবরাহ কার্ড = চাহিদা কার্ড। হরমুজ প্রণালী (আংশিক ব্যবহৃত) + বাব এল-মান্দেব (অব্যবহৃত) + পাইপলাইন (অব্যব্যহৃত) = মজুদ অবমুক্তকরণ (ব্যবহৃত) + চাহিদা হ্রাস (আংশিক ব্যবহৃত) + আরো মূল্য সমন্বয় (আসন্ন)।’

কালিবাফ সতর্ক করে বলেন, সামনেই গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুম, যখন তেলের চাহিদা তুঙ্গে থাকে। যদি তখনও হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।