প্রাণের মেলায় ইফতার
ঢাবি ক্যাম্পাসে বন্ধুত্বের স্বাদ পায় ভিন্ন মাত্রায়
Printed Edition
হারুন ইসলাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস একটা জায়গা যেখানে শুধু পাঠ্যপুস্তকের আলোই নয়, জীবনের সব রঙ ঢাকা পড়ে। আর রমজান মাসে এই ক্যাম্পাসের চেহারা যেন আরো উজ্জ্বল হয়। শেষ বিকেলে যখন সূর্য ডুবতে শুরু করে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন কোণা অদ্ভুত এক উন্মুক্ত আনন্দে ভরে ওঠে- রোজা ভাঙার মুহূর্তের অপেক্ষায়।
সকালে শুরু হওয়া ব্যস্ততার মাঝেও সন্ধ্যার পূর্ব মুহূর্তে একত্র হওয়া, নিজ নিজ ইফতার নিয়ে ভাগাভাগি করা, দোয়া আলোচনা ও একে অপরের সাথে গল্প বলা- এই সব মিলিয়ে এখন ক্যাম্পাসে ইফতার মিলনমেলা যেন একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন। অনেকের কাছে এটি শুধু রোজা ভাঙার সময়ই নয়, বরং নতুন বন্ধুত্ব গড়ার, ক্যাম্পাস জীবনের মিলনের এক সুন্দর প্রকাশ।
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে ক্যাম্পাসের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র প্রাঙ্গণ, হল এলাকা ও একেবারে প্রাণচাঞ্চল্য হয়ে উঠে ছাত্রছাত্রীরা এক সাথে ইফতার করেন ; বিভিন্ন ধরনের ইফতার সামগ্রী উপভোগ করছেন এবং বেশ কিছু সংগঠনের আয়োজন হয়ে ওঠে সন্ধ্যার মূল আকর্ষণ।
রোজা ভাঙার আনন্দ, বন্ধুদের সাথে গল্পে রাতের সুর: কন্দ্রীয় ক্যাম্পাসের ঐতিহাসিক ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পাশাপাশি কার্জন হলের সামনে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাতে জনসমাগম যেন আরো বেড়ে যায়। এখানে বসে থাকলে সহজেই বোঝা যায়- এটা আর সাধারণ একটি ইফতার অনুষ্ঠান নয়; এটা সমবেত অনুভূতির এক উৎসব।
বাংলা ও সাহিত্য বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা রহমান বলেন, ‘এখানে এক সাথে রোজা ভাঙার আনন্দটা ভিন্ন। আমি জানি ক্যাম্পাসে সবাই একই অনুশীলনে রোজা রাখছে, আর সন্ধ্যায় সবাই মিলে মিলে ইফতার করাটা যেন একএকটা ছোট আনন্দের শহর।’
তিনি আরো বলেন, ‘রোজা শেষে যখন ইফতার হয়, তখন সবাই মন্দির, মসজিদ বা ইমারতের পথ হাঁটছে না- এবার তো আমরা ক্যাম্পাসে বসেই একএকটা গল্প, একএকটা হাসির ভাগাভাগি করি। সেই মুহূর্তগুলো একেবারে স্থায়ী স্মৃতির মতো।’
আর ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী রাতুল ইসলাম যোগ করেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডেন্টিটি শুধু পাঠশালার নাম নয়। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে একত্র হওয়ার ক্ষমতা, রোজা ভাঙার সময় এমন আনন্দ, এমন ভ্রাতৃত্ববোধ- আমি মনে করি, তা শিক্ষার জীবনের সবচেয়ে মধুর অধ্যায়।’
ইফতার প্রতিদিনের ছোটবড় উপহার: সম্প্রতি ক্যাম্পাসে ইফতার বিতরণের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে যেখানে ছাত্ররা এক সাথে ইফতার বিতরণ করছে এবং ছোট ছোট আলাপন করছে।
এটি শুধু নিজেদের মধ্যে খাবার ভাগাভাগি করার অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং কিছু সংগঠন ধারাবাহিকভাবে ইফতার আয়োজন করছে। ঢাবি শিবিরের উদ্যোগে প্রতি দিনই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ইফতার সামগ্রী ও সহযোগিতা পৌঁছে যাচ্ছে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর হাতে।
রমজানের প্রথম দিনে ছাত্রশক্তির উদ্যোগেও মোটামুটি এক হাজার ৫০০ ছাত্রছাত্রী এক সাথে ইফতার করে। ইফতার আয়োজনটি হল ও অনুষদ ভিত্তিক পরিচালনা করে আসছেন।
ক্যাম্পাসের রঙিন সন্ধ্যা: ইফতার মিলনমেলায় দেখা যায় বিভিন্ন পটভূমি থেকে আসা শিক্ষার্থীরা একত্রে বসে খাবার ভাগ করে নিচ্ছেন। এটি শুধুই ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; একে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একত্র হওয়ার পথ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ছাত্রছাত্রীদের ভাষ্য, ক্যাম্পাসে রোজা ভাঙা তাদের কাছে যেন একটি ছোটো বিরতিÑ দিনের ক্লাস, লাইব্রেরির চাপ, এসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার মাঝেও এই সন্ধ্যার মিলনমেলা যখন বন্ধুদের সাথে কাটে, সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
আয়েশা বলেন, ‘ক্যাম্পাসে রোজা ভাঙা আমাদের মানসিক শক্তি বাড়ায়, আর বন্ধুদের সাথে হাসাহাসি ও গল্প বড় হয়ে ওঠে জীবনের এক সুন্দর অধ্যায় হিসেবে।’
রাতের অন্ধকার যখন নেমে আসে, সেই আলোয় শিক্ষার্থীদের হাসি, গল্প আর মিলনের ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলো যেন ক্যাম্পাস জীবনের এক অমূল্য রতœ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ধ্যার সেই রঙিন আলো, ইফতার আয়োজনের খুশির আড়ম্বরে মাখানো স্মৃতিÑ সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; একটি মানুষের গল্প, বন্ধুত্বের স্মৃতি ও এক সাথে কাটানো সময়ের জয়জয়কার।