৪ দফা দাবি আদায়ে শিক্ষকদের তিন দিনের কর্মসূচি

৭০০ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ

Printed Edition

শাহেদ মতিউর রহমান

  • আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের তালিকা প্রস্তুত

  • কঠোর শাস্তির কথা ভাবছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়

টানা তিন দিন বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে দেশের সাত শতাধিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ফলে বছর শেষের এই সময়ে বিপাকে পড়েছে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী। গতকাল সোমবার থেকে টানা তিন দিন পরীক্ষা বন্ধ থাকবে বলেও জানিয়েছেন শিক্ষকরা। কর্মসূচির প্রথম দিনে গতকাল সোমবার ৬৭০টির বেশি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা বন্ধ রেখেছেন তারা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রবেশ পদ সহকারী শিক্ষক পদটি বিসিএস ক্যাডারভুক্ত করাসহ চার দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন ৭২১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষকরা।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য বছরের এই সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল জরুরি একটি নোটিশ জারি করেছে। সেখানে যেসব স্কুলে এবং যেসব শিক্ষক দাবি আদায়ের অজুহাতে শিশুদের বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ রেখেছেন তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দাবি আদায়ের অনেক পন্থা বা মাধ্যম আছে। কিন্তু বছরের এই সময়টাতে যারা দাবি আদায়ের জন্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বন্ধ রাখার এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষকরা আন্দোলন করেছেন, ক্লাস বর্জন কিংবা মানববন্ধন বা অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন। কিন্তু এবারই এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে যেখানে খোদ পরীক্ষার্থীদের জিম্মি করে দাবি আদায়ের পথে খুঁজছেন শিক্ষকরা। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এ দিকে গতকাল সকালেই বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষা বন্ধ রাখার খবরে কড়া বার্তা দিয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। এই নোটিশ জেলা প্রশাসক এবং মাউশিকেও দেয়া হয়। নোটিশে বলা হয় আজ (গতকাল) দুপুর ১২টার মধ্য যেসব স্কুলে পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছে সেইসব স্কুলের তালিকা এবং এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষকদের তালিকা (নাম-ঠিকানা ও পদবিসহ) মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়। একই সাথে গতকাল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) থেকেও জরুরি এক পত্রে স্কুলগুলোতে চলমান বার্ষিক পরীক্ষা এবং এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষা নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এরপরেও ৭২১ সরকারি মাধ্যমিকে বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছে। এমনকি আজ মঙ্গলবার ও আগামীকাল বুধবারও পরীক্ষা বন্ধ রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি।

সমিতির এক নেতা ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: মুজাহিদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষক দীর্ঘ দিন ধরেই বঞ্চনার শিকার। আমরাও পরীক্ষা বন্ধ রাখতে চাইনি। কিন্তু বাধ্য হয়েই আমাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আমরা দাবি আদায়ের সব চেষ্টাই করেছি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস পাইনি। সূত্র জানায় গতকাল সারা দিনই দেশের বিভিন্ন স্কুলে পরীক্ষা বন্ধ রাখার বিষয়ে আপডেট তথ্য নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল আগেই নোটিশ দিয়ে পরীক্ষার না নেয়ার কথা জানায়। গতকাল সকালে খুলনায় অবস্থিত সরকারি করোনেশন গার্লস হাইস্কুলের একজন শিক্ষক গণমাধ্যমকে জানান তাদের বিদ্যালয়ে পরীক্ষা হচ্ছে না। রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল ও শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়েও গতকাল বার্ষিক পরীক্ষা হয়নি। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, কুমিল্লা জিলা স্কুল, নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, খুলনার সরকারি করোনেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়েও কর্মবিরতি পালনের তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুরসহ বিভিন্ন বিভাগের অনেক প্রতিষ্ঠানেই পরীক্ষা হয়নি বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

এর আগে গত রোববার বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির নেতারা গণমাধ্যমকে জানান, সরকার যদি তাদের দাবি পূরণ করে তাহলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো নেবেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করবেন। কিন্তু দাবি পূরণ না হলে কর্মবিরতি চলবে। মাধ্যমিক শিক্ষকদের চার দফা দাবিগুলো হলো- সহকারী শিক্ষক পদকে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত করে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর’-এর গেজেট প্রকাশ, বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের বিভিন্ন শূন্য পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন দ্রুত কার্যকর করা, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ দেয়া এবং ২০১৫ সালের আগের মতো সহকারী শিক্ষকদের দুই থেকে তিনটি ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বর্ধিত বেতন-সুবিধা বহাল করে গেজেট প্রকাশ।