হিংসা পরিহারে সহায়ক রোজা

Printed Edition

লিয়াকত আলী

আজ মাহে রমজানের দশম দিবস। রমজানে দীর্ঘ এক মাস রোজা পালনের মাধ্যমে মুমিন বান্দাদের মধ্যে যেসব শুভ উপাদান তৈরি হয়; সেগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হিংসা দমন। মানবতাকে হত্যাকারী একটি দুরারোগ্য ব্যাধির নাম হিংসা। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা:) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, ‘তোমরা পরস্পরে বিদ্বেষ করো না, হিংসা করো না, ষড়যন্ত্র করো না ও সম্পর্ক ছিন্ন করো না। তোমরা পরস্পরে আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও’। (বুখারি ৬০৭৬; মুসলিম ২৫৫৯)।

এখানে চারটি বিষয় উল্লেখ করা হলেও সেগুলো মূলত: একটি বিষয় থেকে উৎসারিত। আর তা হলো ‘হিংসা’। এই মূল বিষবৃক্ষ থেকেই বাকিগুলো কাঁটাযুক্ত ও যন্ত্রণাদায়ক ডাল-পালার ন্যায় বেরিয়ে আসে। হিংসা অর্থ ‘আল্লাহ অন্যকে যে নেয়ামত দান করেছেন সেই নেয়ামতের ধ্বংস কামনা করা’। হিংসার পিছে পিছে আসে বিদ্বেষ। সে তখন সর্বদা ওই ব্যক্তির মন্দ কামনা করে। যেমন মুমিনদের বিরুদ্ধে মুনাফিকদের আচরণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন ‘যদি তোমাদের কোনো কল্যাণ স্পর্শ করে, তাতে তারা অসন্তুষ্ট হয়। আর যদি তোমাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তাতে তারা আনন্দিত হয়’ (আলে ইমরান ১২০)।

যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, তার ঈমান হয় ত্রুটিপূর্ণ। হিংসা তার সমস্ত নেকি খেয়ে ফেলে, আগুন যেমন ধীরে ধীরে কাঠ খেয়ে ফেলে। এভাবে সে নিজের আগুনে নিজে জ্বলে মরে। পরিণামে তার পূর্বে কৃত সৎকর্ম সমূহের নেকিগুলোও ক্রমে নিঃশেষ হয়ে যায়। ঐ অবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে নিঃস্ব অবস্থায় আল্লাহর কাছে চলে যায়। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো- শ্রেষ্ঠ মানুষ কে? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক শুদ্ধহৃদয় ও সত্যভাষী ব্যক্তি’। লোকেরা বলল, সত্যভাষীকে আমরা চিনতে পারি। কিন্তু শুদ্ধহৃদয় ব্যক্তিকে আমরা কিভাবে চিনব? জবাবে তিনি বললেন, ‘সে হবে আল্লাহভীরু ও পরিচ্ছন্নহৃদয়; যাতে কোনো পাপ নেই, সত্যবিমুখতা নেই, বিদ্বেষ নেই, হিংসা নেই’।( মিশকাত ৫২২১)

হিংসুকদের অনিষ্টকারিতা হ’তে বাঁচার জন্য আল্লাহ আমাদের দোয়া করতে বলেছেন- ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই হিংসুকের অনিষ্টকারিতা হতে যখন সে হিংসা করে’ ( সূরা ফালাক, আয়াত ৫)। যে সমাজে হিংসার প্রসার যত বেশি, সে সমাজে অশান্তি তত বেশি। সমাজে ততক্ষণ কল্যাণ ও শান্তি বিরাজ করে, যতক্ষণ সেখানে হিংসার প্রসার না ঘটে। যামরাহ ইবনে ছা‘লাবাহ (রা:) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মানুষ ততক্ষণ কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতক্ষণ তারা পরস্পরে হিংসা না করবে’। (তাবারানী : ৮১৫৭)

হিংসা হচ্ছে অন্যের ভালো কোনো কিছু দেখে তা ধ্বংস হওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার কামনা করা। কেউ ভালো পথে চলতে থাকলে কিংবা ভালো কোনো কাজ করতে গেলে সেখান থেকে তার ফিরে আসা, বাধাগ্রস্ত হওয়া কিংবা ব্যর্থ হওয়ার কামনা করা। এগুলোই হিংসা। এসব হচ্ছে হিংসার প্রথম ধাপ।

মানুষের একটি স্বভাব হচ্ছে, সে অবচেতনভাবেই কামনা করে- সব ভালো জিনিস তার কাছে এসে একত্রিত হোক, যাবতীয় অর্থ সম্মান প্রভাব-প্রতিপত্তি তার হাতে চলে আসুক ইত্যাদি। তার চাহিদা শেষ হয় না কখনো। এক চাহিদা পূর্ণ হলে আরেক চাহিদা এসে হাজির। এক লক্ষ্য অর্জিত হলে আরেক লক্ষ্যের পেছনে অবিরাম ছুটে চলা। এটা স্বাভাবিক। এখান থেকেই জন্ম নিয়ে থাকে হিংসা- এ সম্মান কিংবা এ পদ অথবা এত এত অর্থ আমার কাছে না এসে তার কাছে কেন? তা আমার কাছে চলে আসুক। তা যদি না হয় কমপক্ষে তার কাছ থেকে হারিয়ে যাক। এটাই হিংসা।

পবিত্র কুরআনের একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে বনি ইসরাইল তথা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের আলোচনা। জাতি হিসেবে তাদের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা দান করেছিলেন অনেক বড় বড় নেয়ামত। আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের পবিত্র কাফেলার অনেকেই ছিলেন বনি ইসরাইল গোত্রভুক্ত। তাদেরকে দেয়া হয়েছিল আসমানি একাধিক কিতাব। কিন্তু এতকিছু পেয়েও তারা শোকরগুজার ছিল না। তাদের কিতাবসমূহে শেষ নবীর কথা ছিল। তাঁর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের বিবরণ ছিল। হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা যখন শেষ নবী হিসেবে পাঠালেন, তখন তারা তাঁকে চিনতেও পারল। সে চেনাও কেমন? পবিত্র কুরআনের বর্ণনানুসারে- নিজের ছেলেসন্তানকে মানুষ যতটুকু শক্তির সাথে চেনে, তাদের চেনা ছিল আরো গভীর, আরো শক্তিমান। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবলই ইসরাইলি না হওয়ার কারণে তারা একদিকে তাঁর নবুওত মেনে নিতে অস্বীকার করে। উপরন্তু যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, হজরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেষ নবী হিসেবে মেনে নিয়েছে, তারা যেন এ সঠিক ও সরল পথ ছেড়ে আগের ভ্রান্ত ও বাঁকা পথে ফিরে যায়- তারা সে কামনাও করত। এর মূলে ছিল কেবলই হিংসা। তাদের দোষটির কথা কুরআন মজিদে ঘৃণার সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই মুমিন বান্দাদের উচিত তা পরিহারে সচেষ্ট থাকা। রমজানের রোজা এই গুণ অর্জনে অত্যন্ত সহায়ক। আর এভাবে তাকওয়ার মাত্রা উন্নত হয়।