এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভোগান্তি ১৫ দিনের
আশকোনার পানির পাম্প রাস্তাটি যেন মরণ ফাঁদ
Printed Edition
সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে রিকশায় রাজধানীর আশকোনা পানির পাম্প সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাচ্ছিলেন মরিয়ম বেগম। পানির পাম্পের সামনে যেতেই মা-মেয়েসহ রিকশাটি উল্টে গিয়ে মারাত্মক আঘাত পান। এ সময় উপস্থিত পথচারীরা হাঁটু পানি বেয়ে উল্টে যাওয়া রিকশা থেকে শিশুসহ মাকে উদ্ধার করলেও এ ধরনের একের পর এক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন নারী-শিশুরা। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই রাস্তাটি এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, এখানে প্রতিদিন কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এই রাস্তার পানি জমাট থাকায় এক প্রসূতি নারীর সন্তানও নষ্ট হয়েছে। তবুও প্রকল্পের দায়িত্বরতরা কেউ রাস্তাটি নির্মাণের কাজ শুরু করছেন না। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র রাস্তাটি এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, গত সাত বছর যাবৎ খানাখন্দে ভরা রাস্তাটিতে চলাচলরত এই এলাকার মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। রাস্তার উন্নয়নমূলক কাজ গত তিন বছর আগে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্তরা এখনো কাজই শুরু করেনি। মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে এলাকাবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হয় ১৫ দিন। অথচ সিটি করপোরেশন বা সেনাবাহিনী এখানে এক দিনের জন্যও উঁকি দেয়নি। যদি দেখে যেতেন তাহলে এলাকার দুর্ভোগের চিত্র তাদের নজরে আসত।
গত সোমবার দুপুরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড আশকোনা বাজার সংলগ্ন পানির পাম্পের রাস্তার সামনে গিয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, শত শত অটোরিকশা, ট্রাক, পিকআপ ও প্রাইভেটকার চলাচল করছে খানাখন্দে ভরা পানিভর্তি রাস্তা দিয়ে। সাধারণত রাস্তাটি যে কেউ দেখলে মনে করবে এটি একটি খাল। পাশ দিয়েই স্কুলগামী শিশুদের বাবা-মাকে রিকশা থেকে নেমে রাস্তার উত্তর পাশ ঘেঁষে অনেকটা পানি মাড়িয়ে পারাপার হতে দেখা গেছে। রাস্তার দুই পাশে দোকানপাট থাকলেও রাস্তায় পানি থাকায় দোকানগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় তিন শ’ গজের রাস্তাটি পুরোপুরি চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, খানাখন্দ ও জলাবদ্ধতার কারণে এই রাস্তায় এক প্রসূতি নারী পড়ে গিয়ে তার অনাগত সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। গত সাত বছর ধরে এই রাস্তাটিতে চলাচলে অনেক মানুষের এখন মরণ ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই না।
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দা নাসরিন আক্তার, রাস্তার পানি দেখিয়ে বলেন আমাদের চলাচল এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। বড় কোনো পাপ করেছি, তাই এখানে বাড়িঘর করেছি। আমাদের এই ভোগান্তি কারো চোখেই পড়ছে না। আর কত দিন এই ভোগান্তিতে পড়তে হবে তা জানা নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাসিন্দা বলেন, এই রাস্তার কাজটি মূলত সিটি করপোরেশনের। তিন বছর আগে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈম দায়িত্ব পালন করছিলেন। ৫ আগস্টের পর তিনি পলাতক। তার কাছে বারবার সমাধান চাইতে গিয়ে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। এরপর ডিএনসিসি প্রশাসক বসানোর পর সেই একই অবস্থায় রয়েছে। সিটি করপোরেশনের কারো কাছে গিয়েও সমস্যা সমাধানের কোনো পথ পাচ্ছি না। তারা আশা প্রকাশ করে বলেন, ডিএনসিসি প্রশাসক ও সেনাবাহিনী একটু উদ্যোগ নিলেই লাখ লাখ মানুষের সমস্যা খুব সহজেই সমাধান হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) খন্দকার মাহবুব আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, উত্তরার পানির পাম্পের রাস্তাটির কাজ সিটি করপোরেশন টেন্ডার দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজটি মূলত সেনাবাহিনী করছে। কাজের অগ্রগতি আটকে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি প্রকল্প পরিচালকের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলাম তিনি বলেছেন শিগগিরই কাজ শুরু করবেন। তিনি আরো বলেন, প্রয়োজনে আমরা প্রকল্প পরিচালককে চিঠির মাধ্যমে জানতে চাইব।
আশকোনা পানির পাম্পের রাস্তাটির প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মাসুদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বৃষ্টির মৌসুম হওয়ায় রাস্তাটির কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এখনই রাস্তার কাজটি শুরু করলে সাধারণ মানুষের চলাচলে আরো ভোগান্তি বাড়বে। তারপরও আমরা রাস্তাটি যত দ্রুত কাজ শুরু করা যায় সেটি দেখব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিএনসিসির ১৮টি ওয়ার্ডের মূল সমস্যা সরু রাস্তা। আমরা স্থানীয় বাড়িওয়ালাদের সাথে কথা বলেছি যেন বাড়ির সামনে রাস্তা ছেড়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, আশকোনার রাস্তাটির যে বেহাল অবস্থার কথা শুনলাম আজ ওই রাস্তাটির বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিবো। এরই মধ্যে অনেক অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন, আমরা এমন আশার বাণী শুনে আসছি গত সাত বছর যাবৎ। ভারী বৃষ্টি হলে নাজেহাল রাস্তাটি একেবারেই চলাচলের অনুপোযোগী। ভারী বৃষ্টি হলে কোমর পর্যন্ত পানি জমাট হয়ে থাকে। নোংরা পরিবেশেই চলাচল করতে হয়। গত বছরের মতো এবারো ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এই রাস্তার নোংরা পানির জন্য স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগছে মানুষ। সেনাবাহিনী যদি এই কাজটি এখনো শুরু না করে তাহলে এই এলাকায় বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
সেনাবাহিনীর কাজের ধীর গতির বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, উন্নয়নমূলক প্রকল্প কাজ সেনাবাহিনী খুব দ্রুতগতিতেই করে থাকেন। আশকোনার পানির পাম্পের রাস্তাটিতে শিগগিরই হাত দিবেন।
তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি। আশা করছি শিগগিরই ওই এলাকার জনসাধারণের চলাচলে ভোগান্তি দূর হবে।