বিক্রয়চাপের সাথে বাড়ছে পুঁজিবাজারের লেনদেনও
দেশে প্রথমবার অনুমোদন পেল অরেঞ্জ বন্ড
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
যুদ্ধের প্রভাবে দেশের পুঁজিবাজারে একদিকে বিক্রয়চাপ যেমন কার্যকর রয়েছে তেমনি গত ক’দিন ধরে ধারাবাহিকভাবেই বাড়ছে বাজারগুলোর লেনদেনও। পুঁজিবাজারে গত তিন দিনের আচরণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় এ সময়টিতে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই ধারাবাহিক পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিপরীতে প্রতিদিনই লেনদেনের উন্নতি ঘটতে দেখা গেছে দুই বাজারেই। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা যেকোনো মুহূর্তে বাজার ইতিবাচক মুডে ফেরার বিষয়ে আশাবাদী। এ কারণেই তারা টানা পতনের মধ্যেও বাজারের সাথে থাকছেন।
প্রসঙ্গত, অতীতে দেখা গেছে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন শুরু হলে ক্রমান্বয়ে লেনদেনেও তার প্রভাব পড়ে। বিনিয়োগকারীরা ক্রমান্বয়ে বাজার বিমুখ হয়ে পড়েন। দ্রুতই হ্রাস পেতে থাকে বাজারের লেনদেন। কিন্তু এবার উল্টোটা। গত তিনটি কর্মদিবসে বাজারে ধারাবাহিক পতন ঘটলেও এ সময় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন। সবচেয়ে লক্ষণীয় ছিল দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টকের লেনদেন। বাজারটিতে বেশির ভাগ সময় লেনদেন ১০ থেকে ১৫ কোটির মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও গত তিন দিনে বাজারটির লেনদেনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩২ কোটি ৫৯ কোটি ও ৪৫ কোটি টাকা। যুদ্ধের ঝুঁকি সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের এ সাহসী আচরণ কমবেশি আশান্বিত করছে বাজার সংশ্লিষ্টদের। কারণ অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের বাজার ছেড়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যেত। কিন্তু এবার তা ঘটছে না।
চলমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আহসান উল্যা নয়া দিগন্তকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের লেনদেনই প্রমাণ করে বিনিয়োগকারীরা বাজারের সাথে রয়েছেন। তবে তারা নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির শেয়ারেই বিনিয়োগ সীমিত রেখেছেন। আর এ সময়ে তারা এ বিনিয়োগ থেকে কমবেশি মুনাফাও তুলে নিচ্ছেন। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক আচরণেই ফিরবে, এমনটিই মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে তিনি মনে করেন বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এ মুহূর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এ মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বিনিয়োগে যাচ্ছে না। সবাই যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।
এ দিকে নারী ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশে প্রথমবারের মতো ১৫৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ‘অরেঞ্জ বন্ড’ ইস্যু করার অনুমোদন দিয়েছে পুুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাজেদা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই বিশেষায়িত বন্ডটি বাজারে ছাড়া হবে।
ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এটি একটি জিরো-কুপন বন্ড, যা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ধরনের বন্ডে সরাসরি সুদ দেয়া হয় না; বরং ফেস ভ্যালুর চেয়ে কম মূল্যে (ডিসকাউন্টে) বিক্রি করা হয়। এই বন্ড ইস্যুতে সাজেদা ফাউন্ডেশন অংশীদার হয়েছে ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড এবং সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট এক্সচেঞ্জের সাথে।
অরেঞ্জ বন্ড মূলত একটি বিশেষায়িত বিনিয়োগ মাধ্যম, যা বিশেষভাবে নারী, কন্যাশিশু ও লিঙ্গীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়নে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অর্থ সংগ্রহের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, এই বন্ডটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল এবং পুঁজিবাজারভিত্তিক উন্নয়ন অর্থায়নের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে। এটি বাংলাদেশে ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট (সামাজিক প্রভাব বিস্তারকারী বিনিয়োগ) ব্যবস্থার বিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে। ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড জানায়, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বন্ড বাজার সরকারি সিকিউরিটিজ ও ব্যাংকগুলোর সাবঅর্ডিনেটেড ঋণের দখলে ছিল। এই বন্ডের মাধ্যমে বাজারে প্রথমবার সামাজিক প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি নতুন ফিক্সড ইনকাম অ্যাসেট ক্লাস বা সম্পদ শ্রেণীর সূচনা হলো।
বন্ড থেকে উত্তোলিত অর্থের ৪৮ শতাংশ খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি খাতে, ৩২ শতাংশ নারী নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ ৩৬টি জেলায় জলবায়ু-সহনশীল আবাসন তৈরিতে ব্যয় করা হবে। এই বন্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা একদিকে যেমন করমুক্ত আর্থিক মুনাফা পাবেন, অন্য দিকে নারী ও নারী নেতৃত্বাধীন ব্যবসায় সরাসরি সহায়তার মাধ্যমে পরিমাপযোগ্য সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এই বিনিয়োগের প্রভাব আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীন বার্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এতে স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি নারী ক্ষমতায়নে এই বন্ডের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫২ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। সকালে ৫ হাজার ২৩০ দশমিক ৩০ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকেলে লেনদেন শেষে নেমে আসে ৫ হাজার ১৭৮ দশমিক ৩১ পয়েন্টে। লেনদেনের শুরুতেই বড় ধরনের বিক্রয়চাপের মুখে পড়া বাজারটি এক পর্যায়ে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেও দিনের শেষ ভাগের সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড বিক্রয়চাপের ফলে পেরে ওঠেনি। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৯ দশমিক ৩১ ও ৭ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ২০৩ দশমিক ২৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের পতন ঘটে যথাক্রমে ১৯৬ দশমিক ৭৯ ও ১১৫ দশমিক ৮১ পয়েন্ট।
সূচকের অবনতি ঘটলেও গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের উন্নতি ঘটে। বাজারটির এদিন ৬৮৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ২২ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৬৬৩ কোটি টাকা। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ৫৯ কোটি টাকা থেকে লেনদেন নেমে আসে ৪৫ কোটি টাকায়।