কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কর্দোফান অঞ্চলজুড়ে সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে
সুদানের গৃহযুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
Printed Edition
আলজাজিরা
সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধে অবিলম্বে মানবিক যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কর্দোফান অঞ্চলজুড়ে সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয়ায় এই আহ্বান জোরালো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, সেখানে চলমান নিরবচ্ছিন্ন সহিংসতা ভয়াবহ এবং এতে জড়িত সবাই চিরস্থায়ী নিন্দার মুখে পড়বে।
শুক্রবার বছরের শেষ সংবাদ সম্মেলনে রুবিও বলেন, সুদানে সহিংসতা থামানো জরুরি এবং নতুন বছরটি উভয় পক্ষের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার একটি দারুণ সুযোগ হতে পারে। এতে করে সঙ্ঘাতে আটকে পড়া লাখো মানুষের কাছে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে। তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ডিসেম্বরের শুরু থেকে কর্দোফান অঞ্চলে সহিংসতায় অন্তত ১০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
রুবিও বলেন, সেখানে যা ঘটছে তা ভয়াবহ, নৃশংস। একদিন সেখানে কী ঘটেছে তার পূর্ণ চিত্র প্রকাশ পাবে, আর তখন জড়িত সবাই খারাপ অবস্থায় পড়বে। নভেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠকের পর ওয়াশিংটন কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত মাসাদ বোলুস মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা শেষে দেশে ফিরেছেন। রুবিও জানান, তিনি যুক্তরাজ্যের সহযোগিতায় আঞ্চলিক নেতাদের সাথেও আলোচনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক বলেন, সরকার-সমর্থিত সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে চলমান যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখার পেছনে বাইরের দেশগুলো থেকে অস্ত্র সরবরাহ একটি বড় কারণ। এই যুদ্ধ এখন তৃতীয় বছরে গড়িয়েছে। রুবিও বলেন, এই সব অস্ত্রই বিদেশ থেকে আসছে। কোথাও না কোথাও থেকে এগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং কোনো না কোনো পথেই দেশে ঢুকছে। তিনি বলেন, বাইরের পক্ষগুলোর কাছেই উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে প্রয়োজনীয় প্রভাব রয়েছে।
সঙ্ঘাত পর্যবেক্ষকদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিবেশী দেশগুলোর মাধ্যমে আরএসএফকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে- যদিও আবুধাবি বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্য দিকে এসএএফের সাথে তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একই সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও সৌদি আরব মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাতেও যুক্ত। রুবিও স্বীকার করেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা কঠিন। কারণ অনেক সময় পক্ষগুলো প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা মানে না- বিশেষ করে যখন কোনো পক্ষ মনে করে, যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এগিয়ে আছে।
তিনি বলেন, আমরা জোর দিয়ে বলছি-বাইরের সহায়তা ছাড়া এসব গোষ্ঠীর কেউই টিকে থাকতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হলো পক্ষগুলোকে একত্র করা এবং বাইরের শক্তিগুলোকে তাদের প্রভাব খাটাতে চাপ দেয়া।
কর্দোফানে সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু
বর্তমানে দারফুর থেকে সরে সংঘর্ষের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কর্দোফান। গত দুই দিনে আরএসএফ ও তাদের মিত্ররা ডিলিং শহরের আবাসিক এলাকায় গোলাবর্ষণ করেছে। সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্কের তথ্য মতে, এতে নারী, শিশু ও বয়স্কসহ অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন।
উত্তর কর্দোফানের রাজধানী আল-ওবেইদ- যা দক্ষিণ সুদান, পূর্ব সুদান ও দারফুরের সাথে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র- পরবর্তী সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সুদানে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) প্রধান মোহাম্মদ রেফাত। তার মতে, সেখানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরএসএফের ঘোষিত সমান্তরাল সরকারের তথাকথিত রাজধানী নিয়ালায় এখনো ৬৪ জন চিকিৎসাকর্মী আটক রয়েছেন। বৃহস্পতিবার সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক জানায়, প্রথমে আটক ৭৩ জনের মধ্যে ৯ জনকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এ সপ্তাহে সুদানের জন্য আফ্রিকান ইউনিয়নের বিশেষ দূত দেশটিতে কোনো সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান মানা হবে না বলে মন্তব্য করেন এবং বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে আরএসএফের পদ্ধতিগত হামলার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, অপরাধীরা শাস্তি এড়াতে পারবে না।
এসএএফ ও আরএসএফ, উভয়ের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। দারফুরে, বিশেষ করে আল-ফাশের এলাকায়, আরএসএফের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে, সুদানের এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং এক কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন- যা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সঙ্কট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।