অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ট্রাম্পের
হরমুজে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট ২ জাহাজ জব্দ ইরানের
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
হাজারো মানুষের প্রাণহানি ও বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বড় ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শান্তি আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে তিনি ইরানের ওপর হামলা স্থগিত বা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই ঘোষণার রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পারস্য উপসাগর। হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল বিধি লঙ্ঘনের দায়ে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট দু’টি পণ্যবাহী জাহাজ জব্দ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। খবর আলজাজিরা, রয়টার্স ও তাসনিম নিউজ।
মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের অনুরোধে তিনি এই মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে রাজি হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অনুরোধে তিনি সামরিক বাহিনীকে হামলা স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যতক্ষণ না তেহরান একটি ‘সমন্বিত শান্তি প্রস্তাব’ নিয়ে আসছে।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের প্রস্তাব জমা দেয়া এবং আলোচনা কোনো একটি চূড়ান্ত পরিণতিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত হামলা স্থগিত থাকবে।’ তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের বন্দর ও উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘অবরোধ’ অব্যাহত থাকবে এবং সামরিক বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকবে।
হরমুজে ইরানের ইসরাইলি জাহাজ জব্দ
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালীতে সামরিক অভিযান চালায় ইরান। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, ওমান উপকূলের কাছে আইআরজিসির গানবোট থেকে লাইবেরিয়া ও পানামার পতাকাবাহী তিনটি জাহাজে ভারী মেশিনগান দিয়ে গুলি চালানো হয়। এতে একটি জাহাজের ‘ব্রিজ’ বা নিয়ন্ত্রণকক্ষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, জব্দকৃত জাহাজ দু’টি হলো- ‘এমএসসি ফ্রান্সিসকা’ এবং ‘ইপামিনোদেস’। আইআরজিসির নৌকমান্ডের দাবি, জাহাজ দু’টি ইসরাইলি মালিকানা বা পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাদের অভিযোগ, জাহাজগুলো নেভিগেশনাল তথ্যে কারচুপি করে এবং অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। বর্তমানে জাহাজ দু’টিকে ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর নথিপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তেহরানের কঠোর অবস্থান ও সন্দেহ
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণাকে ইরান অত্যন্ত সন্দেহের চোখে দেখছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ একে ট্রাম্পের একটি ‘কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এর বিশেষ কোনো গুরুত্ব নেই। এদিকে আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরান কোনো যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর অনুরোধ করেনি। তারা আবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, মার্কিন নৌঅবরোধ শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করা হবে।
সঙ্কটের মূলে মার্কিন অবরোধ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই ‘নিয়ন্ত্রিত সঙ্ঘাত’ বা ম্যানেজড কনফ্রন্টেশন বর্তমানে একটি জটিল মোড়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের অবরোধকে ইরান ‘যুদ্ধের শামিল’ মনে করছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ না তুললে তারা পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় বসবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দল-ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সাথে জরুরি বৈঠক করেও তেহরানের ‘নীরবতা’ ভাঙতে পারেননি। ইরানিদের এই নীরবতা এবং একই সাথে সাগরে জাহাজ জব্দের ঘটনা ওয়াশিংটনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বৈশ্বিক প্রভাব
হরমুজ প্রণালী কার্যত আংশিক বন্ধ থাকায় এবং সাগরে অস্থিরতা বাড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দাম নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তবে সাগরে ইরানের এই শক্ত অবস্থান পরিস্থিতিকে যেকোনো সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্কটের পারদ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন, অন্যদিকে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট দু’টি জাহাজ জব্দ করে সরাসরি সঙ্ঘাতের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
তাসনিমের বিশ্লেষণে ৫টি গূঢ় উদ্দেশ্য
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্কটের পারদ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন, অন্যদিকে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট দু’টি জাহাজ জব্দ করে সরাসরি সঙ্ঘাতের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তবে এই ‘যুদ্ধবিরতি’ নিয়ে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এক চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে তাসনিম জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধির জন্য কোনো অনুরোধই করেনি। ট্রাম্পের এই একতরফা ঘোষণার পেছনে পাঁচটি সম্ভাব্য গূঢ় কারণ চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি:
১. যুদ্ধে পরাজয় ও নিরাপদ প্রস্থানের চেষ্টা
প্রথম ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ট্রাম্প এই যুদ্ধে কার্যত হেরে গেছেন। তিনি যুদ্ধের সব সম্ভাব্য কৌশল ও সামরিক সক্ষমতা পরীক্ষা করেও কাক্সিক্ষত জয় পাননি। এই পরিস্থিতিতে সম্মানজনকভাবে যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসাকেই তিনি বর্তমানে সবচেয়ে ভালো বিকল্প মনে করছেন। ‘শান্তি আলোচনা’ বা ‘পাকিস্তানের অনুরোধ’ মূলত তার পরাজয় আড়ালের একটি অজুহাত মাত্র।
২. কৌশলগত প্রতারণা বা বিভ্রম সৃষ্টি
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত বিভ্রান্তি’ তৈরির অপচেষ্টা। ট্রাম্প প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধির ঘোষণা দিলেও বাস্তবে বা পরোক্ষভাবে হঠাৎ হামলা চালাতে পারেন। অথবা যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলা না করে তাদের আঞ্চলিক মিত্র ইসরাইলকে দিয়ে চোরাগোপ্তা সঙ্ঘাত চালিয়ে যেতে পারে, যা যুদ্ধের ছদ্মবেশ হিসেবে কাজ করবে।
৩. ইসরাইলকে সামনে রেখে আড়ালে যাওয়া
তৃতীয় সম্ভাবনা হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ থেকে সরে গেলেও ইসরাইলকে এই সঙ্ঘাতে নিয়োজিত রাখতে পারে। যেমনটি ইতঃপূর্বে লেবাননের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অজুহাতে তারা সঙ্ঘাত চালিয়ে গিয়েছিল, ইরান সীমান্ত বা স্বার্থের ক্ষেত্রেও একই ছক ব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
৪. নৌ-অবরোধ ভাঙতে শক্তি প্রয়োগের হুমকি
চতুর্থ ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত কঠোর। যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ চলতে থাকে, তবে ইরান একে ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা’ হিসেবেই বিবেচনা করবে। তাসনিম স্পষ্ট করেছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই অবরোধ তুলে নেয়া না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালী খুলবে না। প্রয়োজনে তেহরান শক্তি প্রয়োগ করে এই অবরোধ ভেঙে ফেলার পথে হাঁটবে।
৫. অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের ‘ছায়া’ ঝুলিয়ে রাখা
পঞ্চম ব্যাখ্যাটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ না করে ইরানের ওপর যুদ্ধের একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘ছায়া’ বা হুমকি জিইয়ে রাখতে চায়। এতে ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতি অনিশ্চয়তার মুখে থাকবে। তবে তাসনিম সতর্ক করেছে যে, গত বছরের ‘১২ দিনের সঙ্ঘাতের’ চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মৌলিকভাবে ভিন্ন। কারণ, এখন হরমুজ প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধের ছায়া বজায় রাখতে চায়, তবে ওই প্রণালী সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হবে।
বর্তমান বিবাদ ও ঝুঁকি
ইতোমধ্যেই ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালী থেকে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট দু’টি জাহাজ ‘এমএসসি ফ্রান্সিসকা’ ও ‘ইপামিনোদেস’ জব্দ করেছে। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা পাকিস্তানের ইসলামাবাদে কোনো আলোচনাতেই অংশ নেবে না।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণাকে ইরান সন্দেহের চোখে দেখছে। সাগরে আইআরজিসির গানবোটের সক্রিয়তা এবং তাসনিম নিউজের এই তীক্ষè বিশ্লেষণ প্রমাণ করছে যে, আলোচনার টেবিলের চেয়ে পারস্য উপসাগরের রণক্ষেত্রই এখন বেশি উত্তপ্ত।