গাজা পুনর্গঠনে মার্কিন ঠিকাদারদের প্রতিযোগিতা ধনী হওয়ার লক্ষ্যে
‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ দল এগিয়ে তবে বিতর্কে জর্জরিত
Printed Edition
দ্য গার্ডিয়ান
গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপে মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে মার্কিন ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলায় গত দুই বছরে গাজার তিন-চতুর্থাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের আকৃষ্ট করেছে।
হোয়াইট হাউজ টাস্কফোর্স ও রাজনৈতিক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গঠিত বোর্ড অব পিস এখনো কার্যকর না হলেও হোয়াইট হাউজ নিজস্ব গাজা টাস্কফোর্স চালু করেছে। এ টাস্কফোর্সে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জ্যারেড কুশনার, স্টিভ উইটকফ ও আরিয়ে লাইটস্টোন। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন দুই সাবেক কর্মকর্তা- জশ গ্রুয়েনবাউম ও অ্যাডাম হফম্যান, যারা গাজার মানবিক সহায়তা ও লজিস্টিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। হফম্যানের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ তিনি মাত্র ২৫ বছর বয়সে পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছেন।
‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ ঠিকাদার
প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিল গথামস এলএলসি, যারা আগে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কিত অভিবাসী আটক কেন্দ্র ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ পরিচালনার জন্য ৩৩ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি পেয়েছিল। কোম্পানিটি গাজায় মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক-ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছিল। তবে প্রতিষ্ঠাতা ম্যাট মিশেলসন নিরাপত্তাঝুঁকি ও জনমতের চাপের কারণে গাজা প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘গথামস অংশ নেবে না। আমি তাদের শুভ কামনা জানাই।’
সম্ভাব্য বিশাল লাভ
হফম্যানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন গাজায় ৬০০ ট্রাক প্রবেশ করবে, যার মধ্যে মানবিক সহায়তার জন্য প্রতি ট্রাকে দুই হাজার ডলার এবং বাণিজ্যিক ট্রাকে ১২ হাজার ডলার ফি ধার্য করা হবে। এভাবে বছরে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, মানবিক সহায়তাকে ব্যবসায়িক মুনাফায় পরিণত করা হচ্ছে। অনেকেই এটিকে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন চুক্তির মতো আরেকটি ‘লাভজনক বাজার’ হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
মানবাধিকারকর্মী ও দাতব্য সংস্থাগুলো এ পরিকল্পনাকে অমানবিক এবং অদক্ষ বলে সমালোচনা করেছে। আমেরিকান দাতব্যকর্মী আমেদ খান বলেন, ‘এরা কেউই প্রকৃত মানবিক সহায়তাকারী নয়। কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জামের জোগান বাড়ছে না।’ জাতিসঙ্ঘও এখনো স্পষ্ট করেনি, তারা ভবিষ্যতে কিভাবে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নেবে। ইসরাইল গাজার অর্ধেক অংশে পুনর্গঠন নিষিদ্ধ করেছে যতক্ষণ না হামাস নিরস্ত্র হয়। ফলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বিতর্ক
গাজা পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে মার্কিন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। গথামসের মতো কোম্পানি আগে কোভিড-১৯ কর্মসূচি ও আটক কেন্দ্র পরিচালনায় শত শত মিলিয়ন ডলারের সরকারি চুক্তি পেয়েছিল। তাদের রাজনৈতিক দান-অনুদানও আলোচনায় এসেছে। সমালোচকরা বলছেন, মানবিক সঙ্কটকে ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত করা হচ্ছে, যা গাজার জনগণের প্রকৃত প্রয়োজনের সাথে সাংঘর্ষিক।
গাজা পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা মানবিকতার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থে বেশি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেখানে গাজাকে বসবাসযোগ্য করে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে মার্কিন ঠিকাদাররা এটিকে সম্ভাব্য লাভজনক বাজার হিসেবে দেখছে। ফলে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া মানবিক সহায়তার বদলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।