১৭ বছরের সংগ্রামের পর নিজ দেশেই পরবাসী সাদ্দাম

বাবার নামাজে জানাজাও পড়তে দেয়নি জালেমরা

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

১৭ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, ১৫ বছরের জেল-জুলুম এবং রাজপথের লড়াই- শেষ পর্যন্ত এর প্রাপ্তি কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফেনীর পরশুরামের মো: সাদ্দাম হোসাইনের জীবনই যেন এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। যে মানুষটি একসময় রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে নিজের যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন, আজ সেই মানুষটিই স্বাধীন দেশে নিজ ঘর ও ব্যবসা হারিয়ে অনিশ্চয়তার পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

সাদ্দামের রাজনৈতিক জীবন শুরু প্রায় দেড় দশক আগে। তৎকালীন শাসনামলে তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা দায়ের করা হয়, যার বেশির ভাগই তিনি মিথ্যা বলে দাবি করেন। চারবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে। ২০১৩ সালে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে আটক অবস্থায় নির্যাতনের সময় তার ওপর চালানো সহিংসতার দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল- ছেলে যেন তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করে। কিন্তু সেই সুযোগটুকুও তিনি পাননি। সাদ্দামের কণ্ঠে এখনো সেই বেদনার প্রতিধ্বনি শোনা যায় : “জালেমরা আমাকে বাবার নামাজে জানাজায় দাঁড়াতেও দেয়নি।” ব্যক্তিগত এই ক্ষতই তার রাজনৈতিক সংগ্রামকে আরো তীব্র করে তোলে।

পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সঙ্ঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। বহুবার জীবনহানির ঝুঁকি নিয়েও আন্দোলনে অংশ নেয়া এই ব্যক্তি কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেননি। তার ভাষায়, “এটা ছিল দেশের জন্য লড়াই, ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়।”

তবে ৫ আগস্টের পর নতুন বাস্তবতায় তার জীবনে আরেকটি কঠিন অধ্যায় শুরু হয়। সাদ্দামের দাবি- স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র তার ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

স্বজনদের সহায়তায় ফেনীর পোস্ট অফিস রোডে ‘হোটেল পানশি’ ও ‘উৎসব কাবাব’ নামে দুটি রেস্টুরেন্ট চালু করেছিলেন তিনি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই চাঁদাবাজি, হুমকি ও দখলচেষ্টার মুখে পড়েন।

তার অভিযোগ অনুযায়ী, এক সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদারের সহায়তায় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী তার কাছ থেকে জোরপূর্বক সাত লাখ টাকা আদায় করে। তিনি আরো দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের কিছু নেতাও এ সময় কার্যকর ভূমিকা না রেখে উল্টো নীরব থেকেছেন। ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি ঘটে ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি।

সাদ্দামের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজান মাসে রোজা অবস্থায় তাকে অপহরণ করে কয়েক ঘণ্টা ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও তিনি অভিযোগ করেন, মামলার অগ্রগতি ধীর এবং বিচার প্রক্রিয়া অনিশ্চিত।

বর্তমানে তার দুইটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। তার দাবি, সেগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে এবং এতে প্রায় ২১ লাখ ৯০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অব্যবস্থাপনার কারণে স্থাপনার ভেতরের সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিচারের আশায় তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরে আবেদন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে লিখিতভাবে প্রতিকার চেয়েছেন। একইসাথে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

সাদ্দামের প্রশ্ন, “যে দেশের জন্য এত কিছু ত্যাগ করলাম, সেই দেশ কি আমাকে ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারবে না?” তিনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, যদি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উদ্ধার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তাহলে তিনি প্রশাসনিক কার্যালয়ের সামনে সপরিবারে অনশন কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন। এক সময় রাজপথে যার কণ্ঠে স্লোগান ধ্বনিত হতো, আজ সেই কণ্ঠ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় ভারাক্রান্ত।

সাদ্দামের এই গল্প কেবল একজন ব্যক্তির নয়, এটি আমাদের সমাজ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয় : সংগ্রামের স্বীকৃতি কি নিরাপত্তা ও ন্যায়ের নিশ্চয়তায় রূপ নেবে নাকি তা থেকে যাবে শুধুই ইতিহাসের অংশ হয়ে?