ফের দরপতনের শিকার পুঁজিবাজার
প্রভিশন সংরক্ষণে সময় পেল ১১ প্রতিষ্ঠান
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
একদিন ভালো কাটিয়ে ফের পতনের শিকার হলো দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল দেশের দুই বাজারেই সূচকের অবনতি ঘটে। সূচকের বড় ধরনের উন্নতি দিয়ে লেনদেন শুরু করলেও বিক্রয় চাপের কারণে তা ধরে রাখতে পারেনি বাজারগুলো। লেনদেন শুরুর এক ঘণ্টার মাথায় বিক্রয়চাপ বাড়তে শুরু করে। দিনের বাকি সময় এ চাপ অব্যাহত থাকলে দুই পুঁজিবাজারই কমবেশি সূচক হারায়। এ সময় বাজারগুলোতে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগ দরপতনের শিকার হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৩ দশমিক ৪২ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৪ হাজার ৯৫০ দশমিক ৯১ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বুধবার দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৯২৭ দশমিক ৪৯ পয়েন্টে। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় দিন শুরু করা সূচকটি সকাল পৌনে ১১টার দিকে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৯১ পয়েন্টে। এপর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৪০ পয়েন্টের বেশি। কিন্তু এর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় বিক্রয়চাপ। দিনের বাকি সময় বিক্রয়চাপ আর সামলে উঠতে পারেনি বাজারটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৭ দশমিক ৯৬ ও ৪ দশমিক ৮২ পয়েন্ট।
দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১০ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট হারায়। ১৩ হাজার ৮৬২ দশমিক ২৯ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি বিকেলে লেনদেন শেষে ১৩ হাজার ৮৪০ দশমিক ১৫ পয়েন্টে স্থির হয়। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স হারায় যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৬৮ ও ৪ দশমিক ৪১ পয়েন্ট।
সূচকের অবনতি ঘটলেও গতকাল দুই বাজারেই লেনদেনের কমবেশি উন্নতি ঘটে। ঢাকা শেয়ারবাজার বুধবার ৪০৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ২৬ কোটি টাকা বেশি। মঙ্গলবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৩৭৯ কোটি টাকা।
দিনের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায় গতকাল ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের দরপতনই সূচকের অবনতিতে বড় ভূমিকা রাখে। এ খাতগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানি গতকাল দর হারায়। এ ছাড়া দুর্বল ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দিনের সর্বোচ্চ দরপতনের শিকার হওয়ায় বরাবরই সূচকের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তা ছাড়া মঙ্গলবার যেসব কোম্পানির মূল্যস্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল সেগুলোও বিক্রয়চাপের শিকার ছিল গতকাল। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরাও মনে করেন, আর্থিক খাতগুলোর কারণেই বাজার সূচকের উন্নতি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আবার সূচক নিম্নমুখী হতে দেখলেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অধৈর্য হয়ে ওঠেন। এক প্রকার আতঙ্কিত হয়ে তারা বিক্রয়চাপ বাড়িয়ে দেন, যা বাজারকে নেতিবাচক প্রবণতার দিকে নিয়ে যায়। তাই এ খাতগুলোতে শৃঙ্খলা না ফেরা পর্যন্ত বাজারের স্বাভাবিক আচরণ আশা করা যায় না।
এ দিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শেয়ারবাজারের ১১ প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে নেতিবাচক ইকুইটি ও আনরিয়েলাইজড লসের প্রভিশন সংরক্ষণ ও সমন্বয়ের জন্য সময়সীমা বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে স্টক ব্রোকার-ডিলার এবং মার্চেন্ট ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত। ২৫ নভেম্বর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বিএসইসির ৯৮৬তম কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্থার চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : ফিনট্রা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, শেলটেক ব্রোকারেজ লিমিটেড, জয়তুন সিকিউরিটিজ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, বিডিবিএল ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড, হজরত আমানত শাহ সিকিউরিটিজ লিমিটেড, জিএমএফ সিকিউরিটিজ লিমিটেড,ওয়াইফ্যাং সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বিআরবি সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বিএনবি সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বিএমএসএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, মাইডাস ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার ও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের নেগেটিভ ইকুইটি ও আন রিয়েলাইজ লসের প্রভিশন ও সমন্বয়ের সময়সীমা কমিশনের পুর্বোক্ত আদেশ পরিপালন সাপেক্ষে বর্ধিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এর আগে ২৫ নভেম্বরের ৯৮৫তম কমিশন সভায় ৮টি প্রতিষ্ঠান এবং ১৪ নভেম্বরের ৯৮৪তম সভায় ২৮ প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক ইকুইটি ও আনরিয়েলাইজড লসের প্রভিশন সংরক্ষণ ও সমন্বয়ের জন্য শর্তসাপেক্ষে সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল।
গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। ২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৮৫ লাখ ১৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ। ১৫ কোটি ৯২ লাখ টাকায় ২৫ লাখ ৫১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা হয় কোম্পানিটির। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে লাভেলো আইসক্রিম, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, ওরিয়ন ইনফিউশন, মুন্নু ফেব্রিক্স, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, একমি ল্যাবরেটরিজ ও সায়হাম কটন মিলস।
দিনের মূল্যবৃদ্ধির তালিকার শীর্ষে ছিল প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধি হার ছিল ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটা বস্ত্র খাতের কাট্টলি টেক্সটাইল উঠে আসে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। ডিসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশে ওঠা অন্য কোম্পানির মধ্যে বিডি থাই ফুড ৯ দশমিক ৩৫, এমএল ডাইং ৮ দশমিক ৪৩, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ৫ দশমিক ৯৮, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ৫ দশমিক ৩৫, ড্রাগন সোয়েটার অ্যান্ড স্পিনিং ৪ দশমিক ৬৫, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স ৪ দশমিক ১৪, ডেফোডিল কম্পিউটার ৩ দশমিক ৭৪ ও বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমসের ৩ দশমিক ১২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।
একই সময় বাজারটির দরপতনের শীর্ষে ছিল পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স। কোম্পানিটির দরপতনের হার ছিল ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ১০ দশমিক ৩৮ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল প্রিমিয়ার লিজিং। দরপতনের শীর্ষ দশে উঠে আসা অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ৯ দশমিক ৮৭, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ৯ দশমিক ৭৪, ফারইস্ট ফিন্যান্স ৯ দশমিক ৫৮, বিআইএফসি ৯ দশমিক ০৯, মাইডাস ফিন্যান্স ৯ দশমিক ০৯, প্রাইম ফিন্যান্স ৬ দশমিক ৬৬ ও উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি ৬ দশমিক ১০ শতাংশ দর হারায়।