উত্তরায় কোটি টাকা ছিনতাই

নেতৃত্বে ছিল চাকরিচ্যুত দুই সেনা ও পুলিশ সদস্য

দুষ্কৃতকারীরা শনাক্ত

এস এম মিন্টু
Printed Edition

রাজধানীর উত্তরায় কোটি টাকা ছিনতাইয়ের নেতৃত্বে ছিলেন চাকরিচ্যুত সেনা ও পুলিশ সদস্যরা। নগদের ডিস্ট্রিবিউটিং অফিসের কোনো কর্মী বা কেউ ছিনতাইকারীদের তথ্য দিয়েছেন। এরই মধ্যে কয়েকজনকে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। যেকোনো সময় তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে বলে গোয়েন্দাদের একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, দুষ্কৃতকারীরা পেশাদার ছিনতাইকারী। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে তারা জড়িত। এর মধ্যে চাকরিচ্যুত সেনা ও পুলিশ সদস্যরাও রয়েছেন। উত্তরা থেকে তারা নগদ ডিস্ট্রিবিউটরের ১ কোটি ৮ লাখ ১১ হাজার টাকা অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

সূত্র আরো জানায়, দুষ্কৃতকারীরা অত্যন্তড় ধুরন্ধর। তারা ছিনতাইয়ের কাজ শেষ করে মোবাইল ব্যবহার করে না। তবে তাদের সোর্সের মাধ্যমে শনাক্ত করা গেছে। গোয়েন্দারা তাদের নজরদারির মধ্যে রেখেছে। তাদের ধরতে এরই মধ্যে জাল বিছানো হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত শনিবার সকালে রাজধানীর উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কে ছিনতাইয়ের ঘটনার আগ থেকেই ঘটনাস্থল রেকি করে ওঁৎ পেতে ছিল র‌্যাব পরিচয়ধারী ছিনতাইকারীরা। যেখান থেকে টাকা বহন করা হয় সেখান থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত তাদের লোকজনের অবস্থান ছিল বলে জানিয়েছে ঘটনার প্রত্যক্ষদশী ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছিনতাইয়ের এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিত। কারণ, সকালে উত্তরার ওই বাসা থেকে টাকার ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার তথ্য ছিনতাইকারীরা জানতেন। কেউ তথ্য না দিলে তারা কিভাবে জানবে?

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট্ররা আরো জানায়, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহৃত কালো মাইক্রোবাসটির যে রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেটি ভুয়া নম্বর ছিল। দুষ্কৃতকারীরা নিজেদের ছিনতাইয়ের কাজে গাড়ির নম্বর বদল করে ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।

উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের মোড়ের বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ইসমাইল জানান, ঘটনার সময় আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম বাড়ির গেটের বাইরে রাস্তার কোণে। হঠাৎ চিৎকার ও সামান্য ধস্তাধস্তি দেখে আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম গাড়ির দিকে। কাছে যেতেই ওরা পিস্তল দেখিয়ে বলে, ‘আপনাদের কাজ কী যান, গুলি করে দিমু যান..।’ হাতে পিস্তল দেখে পরে আমি আর এগিয়ে যাইনি। পরে শুনছি ওরা ছিনতাইকারী ছিল।’

ওই সড়কের ৪৯ নম্বর বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক কমলা বেগম বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সামনের ফুটপাথ দিয়ে একজন লোককে পায়চারী করতে দেখি। কিছুক্ষণ সে ফুটপাথেও বসেছিলেন। তার পরনে একটি গেঞ্জি (টি-শার্ট) আর প্যান্ট পরা, মুখে একটা মাস্কও ছিল। তখন কিছু মনে হয়নি। হঠাৎ তিন-চারজনের চিৎকার শুনি। চেয়ার থেকে উঠে দৌড়ে গেটে এসে দেখি, একটা কালো গাড়ির সামনে তিন-চারজনকে ধরছে। গায়ে র‌্যাবের পোশাক পড়া দেখছি। তখন ওই ফুটপাথে বসা গেঞ্জি -প্যান্ট পরা লোকটাও মাথায় একটা ক্যাপ পরে দৌড়ে মাইক্রো বাসের দিকে গেল। তখন ওইখান থেকে একটা পোলা (ছেলে) দৌড় দিয়া পলাইতে চাইছিল। তার পিছে তিন-চারজন র‌্যাবের পোশাক পরা লোক এসে ধরে ফেলে। তাদের হাতে পিস্তলও ছিল।

ছিনতাইয়ের এই ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশও তদন্ত করছে। ঘটনার তিন দিনেও আসামি শনাক্ত বা গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

ঘটনার পর গত শনিবার রাতে নগদ ডিস্ট্রিবিউটরের পক্ষ থেকে আব্দুর রহমান বাদি হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় অজ্ঞাত ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়।

এবিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো: মহিদুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনা তদন্তে রাত-দিন কাজ করছে পুলিশ। আমরা ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়েছি। তদন্ত চলছে, তবে এখনো কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

নগদের কেউ জড়িত রয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সন্দেহ করছি, তবে তাদের কেউ জড়িত থাকার কোনো তথ্য প্রমাণ এখনো আমরা পাইনি। তবে আমরা তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।

সোমবার দুপুর থেকে মামলার বাদি আব্দুর রহমান ও নগদের ডিস্ট্রিবিউটরের একজন মো: তারিকুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন মিয়া বলেন, এই ঘটনায় তদন্ত চলছে, পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও ডিবি পুলিশও তদন্ত করছে। এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দুষ্কৃতকারীরা যে অস্ত্র ব্যবহার করেছে তার মধ্যে পুলিশের অস্ত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া ছিনতাইকারীদের হাতে থাকা অস্ত্র ৫ আগস্টের পর পুলিশের ছিনতাই হওয়া অস্ত্রও হতে পারে।

ওই সূত্র আরো জানায়, দুষ্কৃতকারীরা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের এরই মধ্যে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া যে কালো রঙের মাইক্রোবাস ব্যবহার করেছে সেটিরও আসল নম্বর পাওয়া গেছে। দুষ্কৃতকারীরা এতটাই পেশাদার যে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও জামিন নিয়ে ফের ছিনতাই ডাকাতি কাজে নেমে পড়ে।