ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের মধ্যেও রফতানি বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রে
Printed Edition
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের পরও দেশটিতে রফতানি বেড়েছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকসহ অধিকাংশ পণ্যের রফতানি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরী পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য আমেরিকার বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। অর্থনীতিবিদ ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রফতানি আয়ে নতুন মাইলফলক অর্জিত হবে।
তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আমেরিকার বাজরে বাংলাদেশ থেকে ২৯৮ কোটি ডলারের তৈরী পোশাক রফতানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ২৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি রফতানি হয়েছে। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৮০ কোটি ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৭০ কোটি ডলার, মার্চে ৭২ কোটি ডলার এবং এপ্রিলে ৭৬ কোটি ডলারের তৈরী পোশাক রফতানি হয়েছে।
আমেরিকার ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (অটেক্সা) হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, এ বছরের প্রথম চার মাসে আমেরিকা ২৬২২ কোটি ডলারের তৈরী পোশাক আমদানি করেছে। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। দেশের রফতানিকারকরা বলছেন, ট্রাম্পের আরোপ করা ন্যূনতম ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্কের প্রভাব আসতে শুরু করেছে। অনেক মার্কিন ক্রেতা বাড়তি শুল্কের অংশ রফতানিকারকদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরো শুল্কই রফতানিকারকদের বহন করতে হচ্ছে। তথ্যে দেখা যায় বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশের গন্তব্য আমেরিকা। বিশেষ করে তৈরী পোশাক শিল্প (আরএমজি খাত) দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় রফতানি হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে তৈরী পোশাক খাতের অবদান প্রায় ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অন্য পণ্যগুলোর মধ্যে চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, পাটজাত পণ্য ও আইটি সেবাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় রফতানি বাণিজ্য বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে-
প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন খরচ: বাংলাদেশে শ্রমিকখরচ অনেক কম। তৈরী পোশাক খাতে দক্ষ শ্রমিক, উন্নত কারখানা অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ক্রমাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনখরচ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে বাংলাদেশ আমেরিকান আমদানিকারকদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য দিতে সক্ষম হচ্ছে।
চীনের বিকল্প বাজার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান : চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে অনেক আমেরিকান ব্র্যান্ড তাদের উৎপাদন সোর্সিং চেইন পরিবর্তন করছে। চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশের মতো বিকল্প বাজারকে তারা বেছে নিচ্ছে। বাংলাদেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, ব্যবসাবান্ধব নীতি ও দক্ষ শ্রমশক্তি এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে।
উন্নত কারখানা ও সাসটেইনেবিলিটি: বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রিন ফ্যাক্টরি সমৃদ্ধ দেশ। বিশ্বে শীর্ষ ১০০টি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। আমেরিকান ব্র্যান্ডগুলো এখন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই কারণে তারা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে।
নতুন বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য : বাংলাদেশের রফতানি খাত আগের চেয়ে আরো বৈচিত্র্যময় হয়েছে। তৈরী পোশাক ছাড়াও হোম টেক্সটাইল, ডেনিম, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী, জুতা, সিরামিক, আইটি সার্ভিস ও সফটওয়্যার খাত যুক্তরাষ্ট্রে ধীরে ধীরে বাজার সম্প্রসারণ করছে।
শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক : বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দিন দিন সুদৃঢ় হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ রাখতে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখছে তাদের সময়মতো কোয়ালিটি পণ্য সরবরাহের কারণে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় একক বাজার। বিশেষ করে টি-শার্ট, জিন্স, সোয়েটার, উল-গার্মেন্টস, নারীদের ফ্যাশনওয়্যার প্রভৃতির বিপুল চাহিদা রয়েছে আমেরিকার বাজারে। বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকেই বিপুল পরিমাণ পোশাক আমদানি করে থাকে।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। সাসটেইনেবল উৎপাদন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং দ্রুত ডেলিভারির জন্য বাংলাদেশ মার্কিন ক্রেতাদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমাদের রফতানি আরো বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন বাংলাদেশের অনেক পোশাক কারখানায় এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় মেশিন, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্যাটার্ন মেকিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা রফতানি পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে।