দুই বছর পরও ‘জুলাইযোদ্ধারা’ আমলাতন্ত্র ও অন্ধকারে জিম্মি

অনুদান নয়, টেকসই পুনর্বাসন প্রত্যাশা

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও ২০২৪ সালের রক্তঝরা সেসব দিনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আন্দোলনে যারা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই আজও বেঁচে থাকার এক অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজপথে ক্ষমতার পালাবদল হলেও হাসপাতালের বিছানায় বা ঘরের কোণে নিভৃতে কাঁদা মানুষগুলোর জীবনে সেই পরিবর্তনের হাওয়া কতটুকু লেগেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

সরকার শুরু থেকেই আহতদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে সম্মানজনক স্বীকৃতি দিয়ে তাদের উন্নত চিকিৎসা, মাসিক ভাতা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু দুই বছর পর বাস্তব চিত্র বলছে, প্রতিশ্রুতির বড় একটি অংশ এখনো ফাইলের স্তূপে ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে।

পরিসংখ্যান ও স্বাস্থ্যসেবার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ

সরকারি হিসাবে গণ-অভ্যুত্থানে ৮৪৩ জন শহীদ এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত হয়েছেন। তবে জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুসন্ধানী দলের (ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন) প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা এক হাজার চার শতাধিক হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জের কারণে স্থায়ী স্নায়বিক ও শ্রবণ সমস্যায় ভোগা মানুষের সংখ্যাও কয়েক হাজার।

সরকারের পক্ষ থেকে গুরুতর আহতদের জন্য ‘বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড’ চালু ও ২০২৫ সালে ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন’ অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। চলতি ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ দল দেশে এসে চিকিৎসা দিয়েছেন এবং ১৫৪ জন গুরুতর আহতকে সরকারি খরচে বিদেশে পাঠানো হয়েছে।

শ্রেণিভিত্তিক ভাতা ও জীবনের নির্মম বাস্তবতা

সরকার আহতদের আঘাতের ধরন অনুযায়ী তিন শ্রেণীতে ভাগ করে ভাতা প্রদান করছে : ‘এ’ শ্রেণী (গুরুতর আহত/অঙ্গহানি/দৃষ্টিহীন) : এককালীন পাঁচ লাখ টাকা ও মাসিক ২০ হাজার টাকা। ‘বি’ শ্রেণী (মাঝারি আঘাতপ্রাপ্ত) : এককালীন তিন লাখ টাকা ও মাসিক ১৫ হাজার টাকা। ‘সি’ শ্রেণী (কম আঘাতপ্রাপ্ত) : এককালীন এক লাখ টাকা ও মাসিক ১০ হাজার টাকা।

তবে বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই ভাতা জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানান আহতরা।

আল আমিনের গল্প : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে বাম পা হারান নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আল আমিন। ১৮ বছর বয়সী আল আমিন এখন কৃত্রিম পায়ে চলাফেরা করেন। সরকারি আর্থিক সহায়তা পেলেও মানসিক ট্রমা ও দুঃস্বপ্ন তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। দৃষ্টি হারানোদের আর্তনাদ : জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, অন্তত ৫০২ জন চোখে আঘাত পেয়েছেন, যার মধ্যে ২৮ জন সম্পূর্ণ অন্ধ এবং প্রায় ১০০ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। ভোলার সাগর মিয়া, নরসিংদী সরকারি কলেজের মোজাম্মেল হক ও শরীরে ছররা গুলি বয়ে বেড়ানো রাজিব মিয়ার মতো বহু মানুষ আজ অন্ধকারের বাসিন্দা। শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট : মিরপুরে ডান হাত হারানো রিকশাচালক রফিকুল ইসলাম ভাতা পেলেও কর্মহীন হয়ে পড়ার গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছেন।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও তালিকার অসঙ্গতি

পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। কেন্দ্রীয় ও জেলা প্রশাসনের তালিকার মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকায় বহু প্রকৃত আহত ব্যক্তি এখনো সরকারি তালিকার বাইরে রয়েছেন। নথিপত্র নিয়ে দফতরে দফতরে ঘুরে প্রমাণ দিতে হচ্ছে যে তারা আন্দোলনে আহত হয়েছিলেন। প্রশাসনের দাবি, ভুয়া আবেদনকারী বাদ দিতে যাচাই-বাছাইয়ে সময় লাগছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে জুলাইযোদ্ধাদের কেবল ভুক্তভোগী নয়, বরং নতুন বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদা ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

অনুদান নয়, টেকসই পুনর্বাসন চান ‘জুলাইযোদ্ধারা’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর অতিবাহিত হলেও আন্দোলনে আহত হাজারো মানুষের জীবনে নামেনি স্থায়ী স্বস্তি। সরকার থেকে এককালীন অর্থ ও মাসিক ভাতা বিতরণ করা হলেও টেকসই কর্মসংস্থান, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা এবং পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের অভাবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হচ্ছেন ‘জুলাইযোদ্ধারা’।

সরকারের সমাজকল্যাণ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তিন শ্রেণীতে (‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’) ভাগ করে এককালীন অনুদান এবং ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন জেলায় চলমান রয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা বিভাগেই তিন হাজার ৭৭৫ জন আহত যোদ্ধার ভাতার জন্য চার কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে আহতদের অভিমত, বর্তমান ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই মাসিক ভাতা দিয়ে সংসারের খরচ ও ব্যয়বহুল ওষুধ কেনা সম্ভব হচ্ছে না। পঙ্গুত্ববরণ করা কিংবা দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে এই অর্থ অপর্যাপ্ত।

চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি

ঢাকা মেডিক্যাল, নিটোর, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও সিএমএইচে জরুরি চিকিৎসা এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পাওয়া সত্ত্বেও অনেক রোগীর স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি নিরাময় করা সম্ভব হয়নি।

অনেক আহতের শরীরে এখনো সিসার ছররা গুলি আটকে রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করছে। অনেক রোগীর নিয়মিত ফিজিওথেরাপি এবং আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সেলিং প্রয়োজন হলেও তা অপর্যাপ্ত।

জটিল অস্ত্রোপচার ও কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং উপযুক্ত দাতার অভাব চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে।

কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার শূন্যতা

আন্দোলনে আহত হয়ে বহু শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছেন এবং বহু কর্মজীবী মানুষ স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার কারণে চাকরি হারিয়েছেন। মিরপুরের রিকশাচালক রফিকুল ইসলামের মতো শত শত খেটেখাওয়া মানুষ এখন পরিবার পরিচালনায় অক্ষম হয়ে মানসিক অবসাদে ভুগছেন। জাতীয় সংসদে সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা এখনও দৃশ্যমান নয়। আহতদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে :

১. সরকারি চাকরিতে বিশেষ সুযোগ বা কোটা প্রদান।

২. শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা।

৩. জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি।

৪. আজীবন বিনামূল্যে সুচিকিৎসার স্থায়ী আইনগত প্রতিশ্রুতি।

বিশেষজ্ঞদের মত

সমাজকল্যাণ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসন কেবল এককালীন টাকা বা মাসিক ভাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল আসবে না। তাদের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত আধুনিক পুনর্বাসন কেন্দ্র, পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আনা এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।

সরকারের মন্ত্রণালয়গুলো থেকে জানানো হয়েছে যে, চিকিৎসা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন। তবে জুলাইয়ের আহতদের দাবি, তারা কোনো সহানুভূতির পাত্র হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের কাছে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকারটুকু দ্রুত দেখতে চান।