আপিল বিভাগের রায় বহাল

নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশী চুক্তির আইনি বাধা কাটল

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পাদনের পথে থাকা সব আইনি বাধা দূর হয়েছে। টার্মিনালটির পরিচালন প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট পিটিশনের রুল খারিজের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

এই আদেশের ফলে দুবাই সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে এনসিটি পরিচালনার চুক্তি বাস্তবায়নে আর কোনো আইনি বাধা রইল না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের আইনজীবী।

এই মামলায় রাষ্ট্রপে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের সাথে বিদেশীদের যে ম্যানেজমেন্টের চুক্তিটা হচ্ছিল বাংলাদেশ সরকারের সাথে দুবাই গভর্মেন্টের, সেটির স্বচ্ছতাকে চ্যালেঞ্জ করে যে রিটটি করা হয়েছিল, রিটটি প্রথমে খারিজ হয়ে যায় দুই-এক ব্যবধানে। মানে দুজন বিচারপতি বলেন যে এটিতে তাদের কোনো সারবত্তা নেই, আর একজন বলেন যে হ্যাঁ, রুলটিতে সারবত্তা রয়েছে, তাই তিনি রুলটিকে অ্যাবসলিউট করেন। সেটার বিরুদ্ধে যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম আপিল বিভাগে আপিলের অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল দরখাস্ত ফাইল করে এবং দু’দিন শুনানির পরে আজকে (বৃহস্পতিবার) আদেশ দিয়ে ওই হাইকোর্টের অর্ডারের বিরুদ্ধে তারা যে লিভ টু আপিল করেছেন সেটিকে খারিজ করে দেয়া হয়েছে। ফলে এখন সরকার বিদেশী যে প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করতে যাচ্ছে বা যাদের সাথে তাদের কথা চলছিল, তাদের সাথে চুক্তি করার ব্যাপারে আর কোনো বাধা থাকল না।

অনীক আর হক বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের সাথে দুবাই গভর্মেন্টের একটা জিটুজি চুক্তি, যেটাকে আমরা বলি গভর্মেন্ট টু গভমেন্ট চুক্তি হয়। এবং সেটার সাথে আরো আইন থাকে, সেটা হচ্ছে যে প্রাইভেট পার্টনারশিপ অ্যাক্ট, বিদেশ থেকে যারা আমাদের এখানে এসে ইনভেস্ট করবেন তাদের সাথে কাজ করার জন্য আলাদা একটা আইন তৈরি করা হয়। তার সাথে সাথে চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি যারা, তাদেরও আইনের মধ্যে বলা আছে যে, যে পোর্টের যেকোনো কনটেইনার টার্মিনাল বা এই যেগুলো রয়েছে সেগুলোকে তারা বিদেশীদের ম্যানেজমেন্টে অপারেট করার জন্য দিতে পারবে। তো যখন ওই দুবাই গভর্মেন্টের সাথে এই চুক্তিটা হয়, তারপরে তখন এই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালটাকে আইডেন্টিফাই করা হয় যে এখানে তারা ইনভেস্ট করবে।

গত বছরের ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনার চুক্তি প্রক্রিয়াকে ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’ দাবি করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে ‘বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম’। রিটে অভিযোগ করা হয়, উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান বা প্রতিযোগিতামূলক বিডিং প্রক্রিয়া ছাড়া বিদেশী কোম্পানিকে এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া স্বচ্ছতার পরিপন্থী। রিট আবেদনের প্রেেিত হাইকোর্ট সে সময় একটি রুল জারি করেছিলেন।

মামলাটি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে শুনানির পর্যায়ে দুই বিচারপতির মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয় (স্পি­øট জাজমেন্ট)। পরবর্তীতে বিষয়টি বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠানো হয়। প্রায় ছয় সপ্তাহের দীর্ঘ শুনানির পর বিচারপতি জাফর আহমেদ রায়ে উল্লেখ করেন, সরকার চুক্তি সম্পাদনের েেত্র প্রয়োজনীয় সব আইন ও নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে চলেছে এবং প্রক্রিয়াটিতে কোনো অস্বচ্ছতা নেই। এরপর রিটকারী প এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। আপিল বিভাগ উভয় পরে যুক্তি ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে বুধবার শুনানি শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার লিভ টু আপিলটি খারিজ করে দেন।

অনীক আর হক জানান, এটি কেবল একটি সাধারণ ব্যবস্থাপনা চুক্তি নয়, বরং চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নের একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারের প থেকে ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু যখন প্রকল্পের গুরুত্ব ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তখন এর পরিধি দাঁড়ায় দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকায়। দুবাই সরকার এই বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে টার্মিনালটিকে বিশ্বমানের আধুনিক টার্মিনালে রূপান্তর করবে।’

অনীক আর হক আরো উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি আইন এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) আইনের অধীনেই এই বিদেশী অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে আইনি কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

আপিল বিভাগ তাদের রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সংশ্লিষ্ট চুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার কোনো অভাব ছিল না। একই সাথে আদালত মন্তব্য করেন, যারা এই রিটটি দায়ের করেছিলেন, তাদের এই মামলা করার আইনগত অধিকার বা ‘লোকাস স্ট্যান্ডই’ নেই। আইনি ভিত্তিহীনতার পাশাপাশি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করায় সরকারের এই পদপেকে বৈধতা দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।