গাজায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু প্লাবিত তীব্র শীতে অসহায় পরিবারগুলো

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • দক্ষিণ গাজায় তীব্র শীতে ৮ মাসের শিশুর মৃত্যু
  • ২০২৬ সালের শুরুতে ঘোষণা হবে ট্রাম্পের গাজা ‘বোর্ড অব পিস’
  • ফিলিস্তিনি কিশোরকে গুলি করে ট্যাংক দিয়ে চাপা ইসরাইলি বাহিনীর
  • হামাস অস্ত্র জমা দিতে রাজি কিন্তু নিরস্ত্রীকরণ নয়

গাজাজুড়ে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের শত শত তাঁবু টানা দ্বিতীয় দিনও প্লাবিত হয়েছে। নতুন শীতকালীন ঝড়ে বুধবার ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অবিরাম বৃষ্টিতে এসব তাঁবু পানিতে ডুবে যায়। ইসরাইলের দুই বছরের আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর দুর্দশা এতে আরো বেড়েছে। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের।

গাজার সিভিল ডিফেন্স গতকাল বৃহস্পতিবার জানায়, দক্ষিণের রাফাহ এলাকায় সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া বহু তাবু থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বুধবার সতর্ক করে বলেন, গাজাজুড়ে দুই লাখ ৫০ হাজারের বেশি পরিবার জীর্ণ তাঁবুতে ঠাণ্ডা ও বৃষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ঝড় অব্যাহত থাকলে মানবিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে, বিশেষ করে বাস্তুচ্যুতদের জন্য কোনো অস্থায়ী আশ্রয় না থাকায়। মঙ্গলবার গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় জানিয়েছিল, বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত একটি মেরু নিম্নচাপ গাজায় আঘাত হানবে, যা লাখো বাস্তুচ্যুত পরিবারের জন্য হুমকি। বুধবার থেকে হাজারো তাঁবু পানিতে ডুবে গেছে। বিছানা, কাপড়, খাবার সব ভিজে গেছে। শত শত পরিবার ঠাণ্ডায় উন্মুক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

গাজার গণমাধ্যম কার্যালয়ের আগের তথ্যানুযায়ী, ইসরাইলের দুই বছরের হামলায় অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের ন্যূনতম আশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রায় তিন লাখ তাঁবু ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড ঘর প্রয়োজন। জাতিসঙ্ঘ বলছে, গাজা পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার লাগবে। ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

দক্ষিণ গাজায় তীব্র শীতে ৮ মাসের শিশুর মৃত্যু : দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে তীব্র শীতে আট মাস বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু রাহাফ আবু জাজার মারা গেছে। দুই বছরের ইসরাইলি হামলায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো জীর্ণ তাঁবুতে যে কঠিন শীত মোকাবেলা করছে, তার মধ্যেই এ মৃত্যু ঘটেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুনির আল-বুরশ জানিয়েছেন, তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ায় শিশুটি মারা যায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, বৃষ্টিতে ভেজা তাঁবুগুলোতে আরো শিশু, বয়স্ক ও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। তিনি বলেন, কম তাপমাত্রা শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের শরীরের তাপ কমিয়ে দিচ্ছে। অনেকের শ্বাসকষ্ট, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। তাঁবুর ভেতরে আর্দ্রতা ও জমে থাকা পানি নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের জন্য ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরি করছে। ওষুধ বা চিকিৎসা না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে।

গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টিতে পুরো শিবিরগুলো পানিতে ডুবে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে খান ইউনুসের আল-মাওয়াসি এলাকা, দেইর আল-বালাহর আল-বাসা ও আল-বারাকা, নুসাইরাতের সেন্ট্রাল মার্কেট এলাকা এবং ইয়ামুক ও বন্দর (আল-মিনা) এলাকা। তারা জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এখন পানিতে ডুবে যাচ্ছে। ভারী বৃষ্টিতে বহু তাঁবু ভেসে গেছে, যদিও বারবার মানবিক সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছিল। সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, ২৪ ঘণ্টায় তারা দুই হাজার ৫০০টির বেশি জরুরি কল পেয়েছেন- সবই প্লাবিত তাঁবুতে আটকে পড়া পরিবারদের কাছ থেকে।

২০২৬ সালের শুরুতে ঘোষণা হবে ট্রাম্পের গাজা ‘বোর্ড অব পিস’ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, গাজার জন্য তার প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর সদস্যদের নাম আগামী বছরের শুরুতেই ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, এ বোর্ডে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতারা থাকবেন। খবর আনাদোলুর।

হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা আগামী বছরের শুরুতেই এটি করব। বোর্ড অব পিস হবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বোর্ডগুলোর একটি। গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর প্রধানরা এতে থাকতে চান।’ গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে এ বোর্ড গঠনের কথা রয়েছে। তবে এখনো সদস্যদের নামসহ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী এ বোর্ড গাজার প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, তিনি নিজেই এ বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ফিলিস্তিনি কিশোরকে গুলি করে ট্যাংক দিয়ে চাপা ইসরাইলি বাহিনীর : মধ্য গাজায় ইসরাইলি বাহিনী বুধবার এক ফিলিস্তিনি কিশোরকে গুলি করে হত্যা করার পর ট্যাংক দিয়ে চাপা দিয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের জাহের নাসের শামিয়াকে (১৬) প্রথমে গুলি করা হয়, এরপর ইসরাইলি ট্যাংক তাকে চাপা দিলে তার লাশ দুই টুকরো হয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। মিডল ইস্ট মনিটরকে চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, গাজার আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের ভেতরে একটি গণকবর থেকে ৩০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা ধারণা করছে, আগের হামলায় সেখানে তিন শতাধিক মানুষকে কবর দেয়া হয়েছিল। উদ্ধার কাজ এখনো চলছে। বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ১১ অক্টোবর ২০২৫-এ যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৭৯ ফিলিস্তিনি নিহত, ৯৯২ জন আহত এবং ৬২৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমর্থনে গাজায় গণহত্যামূলক অভিযান চালিয়ে আসছে। এতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, অনাহার, অবকাঠামো ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি ও আটক অভিযান চলেছে, যা আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশনা ও বৈশ্বিক আহ্বান উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়েছে।

হামাস অস্ত্র জমা দিতে রাজি, কিন্তু নিরস্ত্রীকরণ নয় : ইসরাইল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজা নিয়ে যে শান্তি পরিকল্পনা চলছে, তার অংশ হিসেবে হামাসকে নিরস্ত্র করা হবে। এর আগে হামাসের শীর্ষ নেতা খালেদ মেশাল ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তারা অস্ত্র ‘জমা’ বা ‘ফ্রিজ’ করতে পারে, তবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ মেনে নেবে না। খবর আল আরাবিয়ার।

১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের আক্রমণের পর শুরু হওয়া যুদ্ধ থামিয়েছে। তবে ইসরাইল প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। কাতারের এক চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে মেশাল বলেন, হামাস অস্ত্র পুরোপুরি ছাড়বে না। তবে অস্ত্র ফ্রিজ বা সংরক্ষণ করে রাখা যেতে পারে, যাতে গাজা থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক উত্তেজনা না ঘটে এমন নিশ্চয়তা দেয়া যায়। এ বিষয়ে এক ইসরাইলি কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘২০ দফা পরিকল্পনার অধীনে হামাসের ভবিষ্যৎ নেই। তাদের নিরস্ত্র করা হবে এবং গাজাকে সামরিকহীন করা হবে।’

মেশাল বলেন, গাজা-ইসরাইল সীমান্তে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনে তাদের আপত্তি নেই। তবে গাজার ভেতরে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনকে তারা ‘দখলদার বাহিনী’ হিসেবে দেখবে। তিনি বলেন, সীমান্তে আন্তর্জাতিক বাহিনী থাকতে পারে, যেমন লেবাননে ইউনিফিল আছে। এতে গাজা দখলদারিত্ব থেকে আলাদা থাকবে। কিন্তু গাজার ভেতরে আন্তর্জাতিক বাহিনী মানে ফিলিস্তিনিদের দৃষ্টিতে তা দখলদার বাহিনী। তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোসহ আরব ও মুসলিম দেশগুলো গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করতে পারে, যাতে গাজার ভেতর থেকে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়।