লুটপাটের পর অন্তঃসত্ত্বা নারীকে আটকে চালানো হয় নির্যাতন
Printed Edition
- নরসিংদীতে তিন বছর আগে আ’লীগ নেতাদের তাণ্ডব
- মামলা না নিয়ে উল্টো হয়রানি পুলিশের
চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুবর্ণা আক্তারকে (২০) নিয়ে বাসায় কথা বলছিলেন দন্ত চিকিৎসক স্বামী তাইজুল ইসলাম। ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট বেলা ১১টায় যখন স্বামী-স্ত্রী এক ফ্ল্যাটে তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগের মনোনীত নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার সাবেক মেয়র মো: মোশাররফ হোসেন প্রধান, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ ৩০ থেকে ৪০ জন সশস্ত্র অবস্থায় বাসায় এসে হাজির। কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই কয়েকজন স্বামী-স্ত্রীকে একটি রুমে নিয়ে আটকে রেখে বেধম মারধর করতে থাকে। আরেক গ্রুপ বাসায় লুটপাট চালিয়ে স্বর্ণালঙ্কার, টাকা, জামা-কাপড় থেকে শুরু করে ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র যা ছিল সবই ট্রাকে করে নিয়ে যায়। এমন তাণ্ডব চলে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী। এরপর অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার স্বামীকে তুলে নিয়ে যায়। পাশেই রাসেল মিয়া ওরফে পরশ বাবুর বাসায়। সেখানে ছাত্রলীগ নেতা মোঃ সিয়াম, আল আমিন (২৮), আরজিন (৩২), ডালিদ (৩২) ও সাকিবসহ ১০ থেকে ১৫ জন রুমে আটকে রেখে চালায় নির্মম নির্যাতন। একপর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও তার স্বামী অসুস্থ হয়ে পরলে তারা খাবার পানি চাইলেও কেউ দেয়নি। এরপর ওই দু’জন আরো অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের একটি রিকশায় করে পাঠিয়ে দেয়া হয় হাসপাতালে। ততক্ষণে স্বামী-স্ত্রী জানতেন না তাদের অপরাধ কি, কেনইবা তারা মারধরের শিকার হচ্ছেন। সেখান থেকে এক কাপড়ে তাদের বের করে দেয়া হয়। তৎকালীন সময় এই তাণ্ডবে যিনি মদদ দিয়েছেন তিনি নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার সাবেক মেয়র মো: মোশাররফ হোসেন প্রধান ও তার লোকজন। ওই সময় লুটপাটের পর বাসায় থাকা ব্যাংকের চেক বই নিয়ে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ আদালতে উল্টো মামলা করে দেন দুর্বৃত্তরা। বাদি আদালতে চেকের মামলা করলেও আসামিকে তিনি এখনো দেখেননি। মিথ্যা মামলার আসামিও বাদিকে এখনো চেনেন না। বর্তমানে দুইপক্ষের আইনজীবী মামলাটি শুনানি করছেন আদালতে। সাক্ষ্যের তারিখ থাকলেও বাদি ও সাক্ষী কেউ আদালতে আসেননি। আওয়ামী লীগ সরকার পালিয়ে যাওয়ার পর তারা সবাই আত্মগোপনে চলে গেলেও চেকের মিথ্যা সাজানো মামলার টাকা পরিশোধের জন্য এখনো চাপ দিয়ে যাচ্ছে ওই সন্ত্রাসীরা। কখনো অজ্ঞাত নম্বর দিয়ে আবার কখনো ম্যাসেঞ্জারে। বর্তমানে ওই দম্পতির নুন আনতে পান্তা ফুরালেও সন্ত্রাসীদের ফোনের ভয়ে এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা।
ভুক্তভোগী সুবর্ণা আক্তার গতকাল শুক্রবার নয়া দিগন্তকে বলেন, সন্ত্রাসীরা ওই সময় আমাদের মারধর করে এক কাপড়ে বাসা থেকে বের করে দেয়। থানায় বারবার গিয়েও ব্যর্থ হই। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা যে তাণ্ডব চালিয়ে লুটপাট করেছে সেটি পুলিশ আমলে না নিয়ে দিনের পর দিন ঘুরাতে থাকে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মাধবদী থানার ওসি রাকিব ও সেকেন্ড অফিসার ফরহাদ হোসেন। অভিযোগটি আমলে না নিয়ে উল্টো সন্ত্রাসীদের পক্ষে ভুক্তভোগীদের হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়তে বলেন।
সুবর্ণা আক্তার আরো বলেন, বিচার না পেয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় না খেয়ে, না পরে অসুস্থ হয়ে পরি। পাঁচ মাস পর আমার ছেলে সন্তান জন্ম নেয়ার পর আরো অসুস্থ হয়ে পরেছি। সন্তানের বয়স এখন দুই বছরের উপরে হলেও এক ফোঁটা বুকের দুধও ছেলের কপালে জোটেনি। আত্মীয়-স্বজনরা কোনো রকম টাকা-পয়সা দিলে ওই টাকায় ছেলেকে দুধ কিনে খাওয়াতে হয়। তিনি বলেন, এখন বড় সমস্যা হলো মিথ্যা চেকের মামলা। প্রতি মাসে আদালতে হাজিরা দিতে হয় স্বামীকে। আদালতে গিয়ে যে খরচ বহন করতে হয় সেই টাকাও নেই আমাদের হাতে। স্বামী কোনো রকম সংসার চালিয়ে গেলেও আর কত সহ্য করব এই মিথ্যা হয়রানি। কোনো অপরাধ না করলেও সন্ত্রাসীরা নরসিংদীর বাধবদী এবং নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর লোকজন গিয়ে সব লুটপাট করে আমাদের নিঃস্ব করে দেন।
ভুক্তভোগীর স্বামী তাজুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীরা আমাদের পথে বসিয়ে দিয়ে চেক নিয়ে গিয়ে মিথ্যা মামলা করেছে। অথচ বাদি আমাকে চেনেন না। গত ১০ জুলাই আদালতে বাদি পক্ষের সাক্ষী উপস্থাপন করার কথা থাকলেও তারা সাক্ষী এবং বাদি কেউ আসেনি।
এমন ঘটনার কারণ জানতে চাইলে তাইজুল ইসলাম বলেন, আমার ভায়রা ভাই ও শ্যালিকা একটি ফ্ল্যাট নিয়ে ভাড়া ছিলাম। ভায়রা এলাকায় মোবাইলের ব্যবসা করতেন। অনেকে তার কাছ থেকে মোবাইল আনতে টাকা দিয়েছে। তারা ভালো অবস্থানেই ছিলেন। বিদেশে থেকে বড় চালানের মোবাইল আসলে সেই চালান আর বের করতে পারেনি। শুল্ক গোয়েন্দা লোকরা সেই চালান আটকে দেন বলে পরবর্তীতে তিনি শুনেছেন। এরপর এলাকাবাসী তাকে চাপ দিলে একপর্যায়ে সে তার স্ত্রী নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পাওনাদাররা কিছু না বুঝেই আমার ঘরে থাকা প্রায় ৩০ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কারসহ মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, নরসিংদীর মাধবদীতে আমি দন্ত চিকিৎসক ছিলাম। সন্ত্রাসীরা এখন নিঃস্ব করে দিয়েছে আমাকে। এখনো সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে থেকে ম্যাসেঞ্জার ওয়াটসঅ্যাপে এবং অপরিচিত নম্বর দিয়ে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বান্টি বাজার থাকেন। অথচ নরসিংদী গিয়ে ভাড়ায় আমার বাসায় সন্ত্রাসী কায়দায় লুটপাট করেছে তারা। আমাকে তিনি চিনেন না। আমিও তাকে চিনি না। অথচ সে আমার চেক নিয়ে মামলা করে দিয়েছে। তার সাথে আমার কোনো লেনদেনের প্রমাণ দিতে পারবেন না। তার সাথে আকাশ, সোহান ও ইসমাইল ভূঁইয়া আমাকে বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে তাইজুল ইসলামের আইনজীবী মিনহাজুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, জাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া চেকের মামলা দিলেও চেকে যে স্বাক্ষর রয়েছে সেটি মো: অমি নামে। কিন্তু তাইজুল ইসলামের নাম অমি না। মামলাটির সাক্ষী পর্যায়ে রয়েছে। অথচ বাদিপক্ষ কি কারণে তাইজুলের কাছ থেকে চেক নিয়েছে তার কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। তিনি আদালতে না এসে আরেকজন সাক্ষীকে মামলা পরিচালনার জন্য আমমোক্তার নামা দিয়েছেন। বাদি এবং সাক্ষী কাউকেই তিনি চেনেন না বলে জানান।
ভুক্তভোগী তাইজুলের বিরুদ্ধে করা চেকের মামলার বাদি জাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়ার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
নরসিংদীর মাধবদীতে যে বাড়িতে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ওই বাড়ির মালিক বশির মিয়া গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, যখন ঘটনাটি ঘটেছে তখন আমি ঢাকায় ছিলাম। আমার কেয়ারটেকারের কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনেছি। আমারতো সেখানে কিছু করার ছিল না।
মাধবদী থানার তৎকালীন অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ফরহাদ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, অনেক দিন আগের ঘটনা। আমি মামলাটির তদন্ত করেছি। কিন্তু ঊর্ধ্বতনরা মামলা নিতে না চাইলে আমি কি করব। তিনি বর্তমানে হবিগঞ্জে কর্মরত আছেন। অনেক দিন হওয়ায় বিষয়টি তেমন মনে নেই তার।