সরকারি চাকরি চেয়েছিল রিয়াজ, ‘শহীদ’ তালিকার নাম না : মায়ের আর্তনাদ

হাবিবুল বাশার
Printed Edition

চব্বিশের জুলাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়; এটি দেশবাসীর বুকে খোদাই হয়ে থাকা এক রক্তাক্ত অধ্যায়। এই জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, কিভাবে একজন সাধারণ তরুণ হয়ে ওঠেন ‘শহীদ’। কিন্তু ‘শহীদ’ শব্দটির আড়ালে থেকে যায় এক বুক স্বপ্নের সমাধি, আর মায়ের কোল খালি হয়ে যাওয়ার গভীর শূন্যতা।

কেরানীগঞ্জের মেধাবী ও পরিশ্রমী তরুণ মো: রিয়াজ ছিলেন সেই জুলাইয়ের এক অকুতোভয় যোদ্ধা। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরের বসিলা ব্রিজের কাছে বুলেটের আঘাতে থমকে যায় মাত্র ২০ বছর বয়সী এই তরুণের জীবন। সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখা সন্তানকে চিরতরে হারান তার মা। রিয়াজের বাবা আসাবুদ্দিনের ভাষ্য স্পষ্ট- দেশের সব শহীদের বিচার হলেই মিলবে তার সন্তানেরও বিচার। কারণ কোনো অর্থ বা জমি তো আর তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না তার রিয়াজকে।

নিস্তব্ধ এক ঘর

কুরিয়ার সার্ভিসের হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে যে ঘরটিতে ফিরে বিশ্রাম নিতেন রিয়াজ, সেই ঘর আজ নিস্তব্ধ। এক কোণে স্তূপ হয়ে আছে কিছু বইখাতা, বাতাসে ভাসছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নের ছোট ভাওয়াল গ্রামের এই ঘরটিই ছিল রিয়াজের আশ্রয়। ২০২৪-এর রক্তঝরা জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ দেয়া হাজারো তরুণের একজন ছিলেন তিনি।

ইস্পাহানি ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের এই মেধাবী শিক্ষার্থী পরিবারকে না জানিয়েই যোগ দিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। ছেলের পড়ার ঘর দেখিয়ে অশ্রুসজল চোখে মা শেফালী বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে বলত, ‘মা, আমি সরকারি চাকরি করব।’ কিন্তু এই সরকারি নাম তো আমি চাইনি। আমার সব কিছু দিয়ে দিলেও কি আমি আমার রিয়াজকে ফিরে পাব!’

১৯ জুলাইয়ের নির্মম বাস্তবতা

আন্দোলন চলাকালীন প্রচলিত ছিল যে, ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরের বসিলায় র‌্যাব ব্যাটালিয়ন কার্যালয়ের সামনের ব্রিজের কাছে হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে প্রাণ হারান রিয়াজ। তবে নিহতের বাবা আসাবুদ্দিন ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান, এটি দূরপাল্লার বা হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলি ছিল না।

রিয়াজ ছিলেন আন্দোলনের একদম সামনের সারিতে, নির্ভীক। ঘটনার দিন পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অন্যরা যখন পিছু হটছিলেন, রিয়াজ সামনে যাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি দেখার পর যখনই সে পিছু হটতে উদ্যত হন, তখনই খুব কাছ থেকে (ক্লোজ শট) তার মাথার পেছনে গুলি করা হয়। বুলেট মাথার ভেতরেই থেকে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

সহযোদ্ধারা রিয়াজের নিথর দেহ প্রথমে বসিলা থেকে আটি বাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান। ততক্ষণে তার সারা শরীর ফুলে নীল হয়ে গিয়েছিল। পরদিন ২০ জুলাই শনিবার বিকেলে ছোট ভাওয়াল কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

পরিবারের আক্ষেপ

রিয়াজের মৃত্যুর পর সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন ও মাসিক ভাতা চালু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, এনসিপিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং ‘স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ পরিবারটির খোঁজখবর রাখছে। তবে এই আর্থিক সহায়তা বা সান্ত¡না রিয়াজের বাবার ভেতরের শূন্যতা পূরণ করতে পারছে না।

আসাবুদ্দিন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা করেননি। অন্য কেউ মামলা করলেও তা পরিবারের ইচ্ছায় হয়নি। রাষ্ট্র বা কোনো নির্দিষ্ট বাহিনীর কাছে তার আলাদা কোনো দাবি নেই। তিনি বলেন, ‘এ দেশকে মুক্ত করার জন্য যত শহীদ হয়েছেন, তাদের সবার বিচার হলেই আমার সন্তানেরও বিচার হয়ে যাবে। টাকা বা জমি দিয়ে কি সন্তান ফিরে পাওয়া যায়?’

স্বপ্নবাজ এক তরুণের অসমাপ্ত গল্প

তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রিয়াজ ছিলেন সবার ছোট। আদরের সন্তান হয়েও কখনো পরিবারের বোঝা হতে চাননি তিনি। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর কলেজে পড়ার পাশাপাশি একটি কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করে নিজের পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত খরচ নিজেই চালাতেন। পরিশ্রমী, বুদ্ধিদীপ্ত এবং পড়াশোনার প্রতি গভীর অনুরাগী এই তরুণ নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন।

আজ দেশের আকাশে স্বাধীনতার নতুন সূর্য উঠলেও শেফালী বেগমের ঘরে রয়ে গেছে শুধুই অন্ধকার। রিয়াজেরা চেয়েছিলেন এক বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ; যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে, সরকারি চাকরি হবে সম্মানের প্রতীক। সরকারি খাতায় রিয়াজ আজ ‘শহীদ’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন। কিন্তু এক মায়ের শূন্য বুক আর বাবার নিঃশব্দ হাহাকারের কাছে এই তকমা যেন এক অনন্ত আক্ষেপের নাম হয়েই থেকে যাচ্ছে।