হাসিনাপুত্র জয়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহ্মেদ পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়েছে। বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ আমলে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর উপস্থিতিতে এই আদেশ দেয়া হয়। প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন এবং জয় ও পলকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।

অভিযোগ আমলে নিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মামলার আরেক আসামি হিসেবে জুনায়েদ আহ্মেদ পলককে এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে ১০ ডিসেম্বর।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে জয় ও পলকের বিরুদ্ধে ইন্টারনেট বন্ধ, উসকানি দেয়াসহ মোট তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সারসংক্ষেপ নি¤œরূপ:

১. উসকানিমূলক ফেসবুক স্ট্যাটাস ও সহিংসতা সংঘটনে সহায়তা

অভিযোগ : আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাত ও ১৫ জুলাই আসামি সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের অনুমোদনক্রমে ও জ্ঞাতসারে জুনাইদ আহমেদ পলক তার ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে তিনটি উসকানিমূলক স্ট্যাটাস প্রদান করেন।

ক্ষয়ক্ষতি : এতে অগণিত শিক্ষার্থী আহত হয়, আহতদের চিকিৎসায় বাধা প্রদান করা হয় এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত নির্যাতন অব্যাহত থাকে। এই সময়ে সারা দেশে আবু সাঈদসহ এক হাজার ৪০০ এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয় এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে গুরুতর জখমসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটন করা হয়, যা আসামিদ্বয়ের নির্দেশ/জ্ঞাতসারে/সুযোগ তৈরি করে দেয়া মতে সংঘটিত হয়েছে।

২. যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ইন্টারনেট বন্ধ ও গণহত্যা আড়াল

অভিযোগ : শেখ হাসিনা ও আসামি সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের আদেশ, নির্দেশ, অনুমোদন ও জ্ঞাতসারে, জুনায়েদ আহমেদ পলক ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে শনাক্ত করার মাধ্যমে আটক, নির্যাতন ও হত্যার নির্দেশ কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে দেয়ার লক্ষ্যে প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে ও পরে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেন।

ইন্টারনেট বন্ধের ফলে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার পরস্পর যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যায় এবং মোবাইল সিম ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের অবস্থান সহজে শনাক্ত করে গ্রেফতার ও দমনাভিযান অব্যাহত থাকে। ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে মারণাস্ত্র থেকে গুলি করা হয়।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও ও হাতিরঝিল থানা এলাকায় গঙ্গাচরণ রাজবংশী (৫৬), রাসেল মিয়া (৩২) সহ বর্ণিত ২৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

৩. ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি প্রতিহত করার অপচেষ্টা ও গণহত্যা

অভিযোগ : পূর্ব ঘোষিত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি প্রতিহত করতে এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে মরিয়া প্রয়াস হিসেবে, আসামিদ্বয়ের আদেশ/নির্দেশ/অনুমোদন/জ্ঞাতসারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডারদের দ্বারা ঢাকার উত্তরা এলাকায় শিশু জাবির ইব্রাহীম (৬), সামাউল আমান নুর সহ বর্ণিত ৩২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং বহু সংখ্যককে গুরুতর জখম করা হয়।

রেদোয়ানুলসহ দুই সেনা কর্মকর্তার অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু

গত বছরের জুলাই-আগস্টে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়েছে। গতকাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে শুনানি শুরু হয়।

সকাল সোয়া ১০টার পর ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। এ মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি করবে প্রসিকিউশন।

এদিনও নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ছিল ট্রাইব্যুনালের আশপাশ এলাকা। হাইকোর্টের মূল অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল।

রেদোয়ানুল ছাড়া অপরজন হলেন বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা মেজর মো: রাফাত বিন আলম। পলাতকরা হলেন ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো: রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মশিউর রহমান। পলাতকদের পক্ষে গত ২৪ নভেম্বর স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১।

ওই দিন দুই সেনা কর্মকর্তার হয়ে আইনি লড়াই করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাসুদ সালাহউদ্দিন।