পরিবর্তন আসন্ন : কে হচ্ছেন বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান

Printed Edition

নাসির উদ্দীন চৌধুরী

নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অন্যান্য সব খাত ও বিভাগের মতো আার্থিক খাতের শীর্ষ পদগুলোতে পরিবর্তন আনা শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বুধবার দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদে পরিবর্তন করা হয়েছে। আগের গভর্নরের স্থলে দায়িত্ব¡ নিয়েছেন নতুন গভর্নর। এখন আর্থিক খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন নিয়েও নানা গুঞ্জন ভাসছে বাতাসে। কে হচ্ছেন পরবর্তী চেয়ারম্যান? এখনো চূড়ান্ত কিছু জানা না গেলেও কিছু নাম বাতাসে ভাসছে। যেখানে পুঁজিাবাজার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি যেমন রয়েছেন তেমনি শোনা যাচ্ছে একাডেমিক ব্যক্তির কথাও।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৮ আগস্ট বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশদ মাকসুদের নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেন। একদিকে ভঙ্গুর ব্যাংক ব্যবস্থা, অন্য দিকে চরম অনিয়ম ও অব্যাবস্থাপনার শিকার পুঁজিবাজার অর্থব্যবস্থার এ দুই বিভাগ নিয়ে চরম চ্যালেঞ্জর মুখে পড়তে হয় সংস্থাটিকে। কারণ ব্যাংকিংখাতের নীতি নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা মুখ্য হলেও তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে সরকারি বেসরকাাির বেশিরভাগ ব্যাংকের শৃঙ্খলার সাথে জড়িত বিএসইসি। সেই সাথে তালিকাভুক্ত অন্যান্য খাতের প্রায় চার শতাধিক কোম্পানিতো আছেই। প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে অব্যবস্থাপনার শিকার পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল সংস্কারের পাশাপাশি বাজারের স্বাভাবিক গতি ধরে রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা বিধান করা। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কমিশন এ দু’টি কাজ করতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতা পেলেও অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য অধরা ছিল।

বর্তমান কমিশন সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার পরিচায় দিয়েছে যখন বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে এগুলোর মূলধন শূন্য ঘোষণা করে। এসব ব্যাংকে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর হাজার হাজার কোটি টাকার পুঁজি আটকে ছিল, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে শূন্যে পরিণত হয়। এ সিদ্ধান্ত পথে বসিয়ে দেয় হাজার হাজার বিনিয়োগকারীদের। পরবর্তীতে ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়েও একই ব্যর্থতার দায় নিতে হয়েছে বিএসইসিকে। আর এ দুই ঘটনায় বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। উভয় ক্ষেত্রেই বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

তাই নতুন সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় চাওয়া তাদের পুঁজির সুরক্ষা। তারা এমন চেয়ারম্যান চান যাতে প্রয়োজনের মুহূর্তে তাকে কাছে পান। এ পর্যন্ত চেয়ারম্যান পদে কয়েকজনের নাম শোনা গেলেও সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে এক সময়ের ডিএসই বোর্ডের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির।

এর আগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আমলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক এ দায়িত্ব পালন করলেও প্রত্যক্ষভাবে পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন জিয়াউল হক খোন্দকার। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাধে সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের খেয়াল খুশিমতো চলতে গিয়ে পুঁজিবাজারকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন তিনি। সেই চিন্তা থেকেই পরপর দুই বার বিশ^বিদ্যালয়ের দুই জন শিক্ষক এ দায়িত্ব পালন করলেও তাদের অযোগ্যতারই বলি হতে হয়েছে দেশের পুঁজিবাজারকে। দুই চেয়ারম্যানই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষক সংগঠন থেকে নেয়া যারা তাদের পুরো সময় নানাভাবে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নানা ধরনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একদিকে নিজেরা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন অন্য দিকে পুরো কমিশনকে একটি সিন্ডিকেটে পরিণত করেছেন যার ফলে প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময়জুড়ে ধুকছে দেশের পুঁজিবাজার।

নতুন কমিশন নিয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসা নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএসইসি চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারি আমলা যেমন দেখেছি তেমনি দেখেছি একাডেমিক ব্যক্তিদেরকেও। এদের মধ্যে দু’-একজন ছাড়া কারো দ্বারাই পুঁজিবাজারের জন্য প্রকৃতপক্ষে কোনো উপকার হয়নি। বছরের পর বছর একই স্থবিরতার মধ্য দিয়ে চলছে পুঁজিবাজার। গত দেড় বছরে রাজনৈতিক সরকারের বাইরে থাকার পরও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি ঘটেনি। তাই চেয়ারম্যান হিসাবে এমন কাউকে দরকার যিনি বাজারকে কাছে থেকে বুঝতে পারেন এবং এখানে চলমান সঙ্কট উত্তরণে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে পারেন। তার মতে এটা পুঁজিাবাজরের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হলেও ক্ষতি নেই।

কেমন চেয়ারম্যান চান এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, পুঁজিবাাজরের সমস্যা খুবই কাছে থেকে যারা দেখেন তাদের কাউকেই বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া দরকার। অতীতে বড় বড় আমলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা শিক্ষকরা এ দায়িত্ব পালন করলেও তারা আসল কাজটি করতে পারেনি। এখনো আমরা পুঁজিবাজার নিয়ে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিই। কেন অর্থনৈতিক দিক অনেক এগিয়ে থাকার পরও আমাদের পিছিয়ে থাকা দেশের উদাহরন টানতে হয়? কেন আমরা আমাদের পুঁজিবাজারকে কাক্সিত লক্ষ্যের দিকে নিতে পারব না?

১৯৯৩ সালের ৮ জুন গঠিত হয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একজন সরকারি আমলা সুলতান উজ জামান খান হন প্রথম চেয়ারম্যান হন ওই কমিশনের। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সালের প্রথম কয়েকমাস তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছর ড. হারুনুর রশিদ নামে আরো একজন সাময়িকভাবে বিএসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছর বিএনপি সরকারকে হটিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব¡ নেয়। এ পর্যায়ে বিএসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান আর এক আমলা এম এ সাইদ যিনি পরবর্তীতে প্রধান নির্বাচনণ কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের প্রথম সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো দেশের পুঁজিবাজারে সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা দেশের পুঁজিবাজারে প্রথম বিপর্যয় ঘটে।

২০০১ থেকে ২০০২ পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন মনিরুদ্দিন আহমেদ। ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিএসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলে ড. মির্জা এবি আজিজুল ইসলাম যিনি পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ পর্যন্ত যত চেয়ারম্যান দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের মধ্যে ড. মির্জা এবি আজিজুল ইসলামকেই সফল চেয়ারম্যান হিসেবে ভাবা হয়। তার হাত দিয়ে বেশ কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

২০০৬ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিএসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন আরেক আমলা ফারুখ আহমেদ সিদ্দিকী। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে ফারুখ আহমেদ সিদ্দিকীর স্থলে চেয়ারম্যান নিয়োগ পান রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হক খোন্দকার। সেই সময়ের সরকার ঘনিষ্ঠদের তদবিরেই তাকে ওই পদে নিয়োগ দেয়া হয়। আর তার নিয়োগের পরপরই ২০১০ সালে পুনরায় বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে পুঁজিবাজার। এভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের দুই আমলে দু’বার বিপর্যয়ের মোকাবেলা করতে হয়েছে দেশের পঁুঁজিবাজারকে। আর সেই বিপর্যয় এখনো কাটিয়ে ওঠতে পারেনি পুঁজিবাজারগুলো।

এর পর দুই মেয়াদে এ দায়িত্ব¡ পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শীর্ষ পর্যায়ের অধ্যাপক ড. খায়রুল হোসেন ও ড. শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম। এ দু’জনের হাতেই মূলত ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায় দেশের পুঁজিবাজার। নতুন চেয়ারম্যানের কাছে থাকবে প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ ধসে পড়া পুঁজিবাজারকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করা যাতে দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য পুঁজিবাজার উপহার দেয়া যায়।