ম্যাপল পাতার স্বরলিপি
Printed Edition
মুহাম্মদ কামাল হোসেন
আমার জানালার ধারে প্রতি শীতে একটা ম্যাপল গাছ পাতা ঝরায়। গাছটা পুরনো, তার ডালপালা শহরের ঘিঞ্জি আকাশটাকে যেন ছেঁড়া মানচিত্রের মতো দেখায়। কিন্তু আমি ঋতুভেদে পাতা ঝরানো দেখি না, আমি দেখি শুধু একটা জিনিস: নীরবতা। আমার ফ্ল্যাট নম্বর ৩বি-তে বসে, আমি বছর তেইশের অরিমা, দিনের অধিকাংশ সময় কাটাই সেই নীরবতার স্বর শুনতে।
আজো দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। হলুদ আলোয় ঘর ভেসে যাচ্ছে, ঠিক যেমন শরতের শেষে ম্যাপল পাতাগুলো রঙ বদলায়। টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটি ডায়েরি, পুরনো কাপড়ের মতো নরম তার মলাট। এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমার নীরবতার উৎস আমার বাবা। বাবার মৃত্যুর পর আজ প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। অথচ তার স্মৃতি যেন দিনে দিনে ফিকে হওয়ার বদলে আরও তীব্র হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট জিনিসের জন্য।
ডায়েরিটা খুলতেই পাতা থেকে আলতো করে খসে পড়ল একটি শুকনো ম্যাপল পাতা। পাতাটা গাঢ় বাদামি, শিরা-উপশিরাগুলো সময়ের সাথে সাথে প্রায় কালো হয়ে গেছে। এটি কেবল একটি পাতা নয়, এটি একটি স্বরলিপি।
পাতাটির তলায় বাবার হাতের লেখায় ছোট্ট করে লেখা ছিল : ‘কলকাতা, ১লা অক্টোবর, ১৯৯৮। সন্ধ্যা ৭:৩০। সুরটা মনে রেখো, মা। এটা আমাদের চুক্তি।’
আমি তখন খুব ছোট, হয়তো আমার জন্মের বছরটা হবে। চুক্তির অর্থ কী, কেনই বা একটা পাতার ওপর একটি তারিখ আর সুরের কথা লেখা- এর কিছুই আমার জানা নেই। মা মারা যাওয়ার পর বাবা নিজেকে আরও গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমাদের সম্পর্ক ছিল গভীর, কিন্তু তাতে অনেক না বলা কথা ছিল, যা এখন কেবল রহস্যের কুয়াশা।
ম্যাপল পাতাটা হাতে নিয়ে আমি উঠে দাঁড়াই। পাতাটা ধরে রাখলে আমার হাতে একটা অদ্ভুত শীতল অনুভূতি হয়, যেন সেই ১৯৯৮ সালের অক্টোবরের সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটের শীতল হাওয়াটা আমার হাতে লাগছে।
আমার মা ছিলেন একজন সঙ্গীতশিল্পী। খুব ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। বাবার সাথে তার পরিচয়ও হয়েছিল গানকে কেন্দ্র করে। মা মারা যাওয়ার পর বাবা আর গান শুনতেন না। অথচ এই পাতার স্বরলিপিটা সঙ্গীতের কথাই বলছে।
আমি ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বাবার পুরনো গানের রেকর্ডের আলমারিটার সামনে দাঁড়াই।
আলমারিতে পুরোনো দিনের রেকর্ড প্লেয়ার আর অসংখ্য ভিনাইল ডিস্ক। বাবা এগুলো সযতেœ রেখেছিলেন। আমি আলমারি খুলে খুঁজতে শুরু করি। ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘নজরুল’, ‘আধুনিক বাংলা’ বিভিন্ন লেবেলে ডিস্কগুলো সাজানো। এর মধ্যে একটা ডিস্ক চোখে পড়ল, যার লেবেলে হাতে লেখা : ‘তৃতীয় পক্ষ’। ডিস্কটা কোনো কোম্পানির লেবেল লাগানো নয়, হাতে লেখা, তাতে তারিখ দেওয়া : ১লা অক্টোবর, ১৯৯৮।
আমার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। এ তো সেই একই তারিখ, যা ম্যাপল পাতায় লেখা!
আমি তাড়াহুড়ো করে রেকর্ড প্লেয়ারে ডিস্কটি বসাই। ধুলো ঝেড়ে প্লেয়ারটা চালু করি। কাঁটাটা ডিস্কের ওপর পড়তেই ফ্ল্যাট নম্বর ৩বি-এর নীরবতা ভেঙে যায়। প্লেয়ার থেকে ভেসে আসে এক মিষ্টি সুর, যা পরিচিত রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়, আধুনিক বাংলা গানও নয়। সুরটা ধীর, শান্ত, কিন্তু তাতে একটা চাপা বিষাদের সুর মিশে আছে। যেন কেউ গভীর রাতে একা একা গুনগুন করছে।
আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি। সুরটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না, সম্ভবত এক মিনিটের মতো। সুরটা শেষ হতেই একটা কণ্ঠস্বর শোনা যায়। কণ্ঠস্বরটা স্পষ্ট নয়, যেন টেলিফোনের ওপার থেকে কেউ কথা বলছে, কিন্তু আমি বুঝতে পারি, এটি আমার মায়ের কণ্ঠস্বর।
মা বলছেন, ‘সুরটা রইল, অরি। তোমার কাছে। আর সেই উত্তরটা... সেটা তুমি ম্যাপল গাছের নিচে পাবে।’
অরি? অরিমা? নাকি বাবা? বাবার ডাকনাম কি অরি ছিল? আর ‘উত্তর’ বলতে কী বোঝাচ্ছেন মা? আমার মাথায় হাজার প্রশ্ন ভিড় করে।
আমি ডিস্কটা প্লেয়ার থেকে বের করে হাতে নিই। ডিস্কের পেছনের দিকে চোখ পড়তেই দেখি, সূক্ষ্ম আঁচড় দিয়ে কিছু একটা লেখা আছে। খুব ছোট করে, যেন গোপন সংকেত: ‘৪৫/বি’।
ম্যাপল পাতা, একই তারিখ, একটি গোপন সুর, মায়ের কণ্ঠস্বর, উত্তরের বার্তা এবং এখন নতুন সঙ্কেত- ৪৫/বি। ফ্ল্যাট নম্বর ৩বি-এর এই শান্ত বিকেলে আমার বাবা-মায়ের এক পুরনো, গোপন গল্প হঠাৎই যেন জীবন্ত হয়ে উঠলো। এখন আমার কাজ হলো এই স্বরলিপির প্রতিটি নোট উদ্ধার করা।
‘৪৫/বি’। সঙ্কেতটা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। এটা কি কোনো রাস্তার ঠিকানা? পুরনো ফ্ল্যাট বাড়ির নম্বর? নাকি বাবার কোনো গোপন লকারের চাবি? আমি দ্রুত ইন্টারনেট ঘাঁটতে শুরু করি। আমাদের পুরোনো শহর কলকাতায় ‘৪৫/বি’ দিয়ে শুরু হওয়া বহু ঠিকানা আছে- বেশির ভাগই পুরনো পাড়া বা বাই লেনের নম্বর।
রাতে আমার ঘুম হলো না। সেই এক মিনিটের সুরটা আমার কানে বাজতেই থাকল। সুরটা যতবার শুনি, ততবারই মনে হয়, যেন মা আমাকে ডেকে বলছেন, ‘এসো, এসো, তোমার জন্য একটা উপহার রেখে গেছি।’ আর সেই উপহারের চাবিকাঠি হলো ৪৫/বি।
পরের দিন ভোরে আমি স্থির করলাম, আর দেরি নয়। ম্যাপল পাতাটা আর ডায়েরিটা ব্যাগে ভরে বেরিয়ে পড়লাম। আমি জানি, বাবা আর মা দু’জনের জীবনেই একটা বিশেষ জায়গা ছিল- কলেজ স্ট্রিটের কাছাকাছি একটা ছোট্ট ক্যাফে, যেখানে তারা প্রথম দেখা করেছিলেন।
ট্যাক্সি নিয়ে আমি যখন পুরনো পাড়ার দিকে এগোচ্ছি, তখন চারপাশের ভিড়, হর্ন আর মানুষের চিৎকার আমার মনোযোগ ভাঙতে পারছিল না। আমার চোখ খুঁজছিল ৪৫/বি।
গাড়িটা একটা পুরনো বাই লেন ধরে এগোতেই চোখে পড়ল একটা জীর্ণ গেট। ওপরে লেখা: ‘শ্রীকৃষ্ণ ‘নিবাস’। গেটের পাশে দেওয়াল ঘেঁষে ছোট একটা ফলক, তাতে নাম্বার খোদাই করা: ৪৫/বি, কলেজ স্ট্রিট।
আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। এত সহজে উত্তরটা পেয়ে যাব, তা আমি ভাবিনি।
ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছিলাম না। এটি কোনো ক্যাফে বা লাইব্রেরি নয়, একটি সাধারণ পুরোনো বাড়ি, যেখানে মানুষজন বসবাস করে। ইতস্ততভাবে গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই এক বয়স্ক দারোয়ান এলেন।
‘কাকে চাই, মা?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমি... আমি এখানে রবিন চৌধুরী নামে কাউকে খুঁজছিলাম। অনেক বছর আগে উনি এখানে থাকতেন।’
দারোয়ান কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন। ‘রবিন? ওহ, রবিন স্যার! হ্যাঁ, বছর দশেক আগে উনি এখানে ভাড়া থাকতেন। ওপরের তলার একটা ছোট ঘর নিয়ে। তবে ওনার তো মৃত্যু হয়েছে, তাই না?’
আমি মাথা নাড়লাম। ‘হ্যাঁ, তিনি আমার বাবা। আমি ওনার বিষয়ে কিছু জানতে এসেছি।’
দারোয়ান বললেন যে, রবিন স্যার খুব ভালো মানুষ ছিলেন, গান ভালোবাসতেন। প্রায়ই ছাদে উঠে একা একা গুনগুন করতেন। দারোয়ান একটা পুরনো চাবির গোছা দেখিয়ে বললেন, ‘ওনার ঘরটা এখনো খালিই আছে। শুধু জিনিসপত্র সব সরানো হয়েছে। আপনি চাইলে একবার দেখতে পারেন।’
আমি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে যেন আমার বাবা-মায়ের ফেলে আসা সময়ের গন্ধ লেগে আছে। ছোট একটা ঘর। আলো-হাওয়া তেমন আসে না। ঘরের এক কোণে পুরোনো একটা আলমারি, দেয়ালে আবছা হয়ে যাওয়া একটা জলছাপ।
ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি বাবার সেই গুনগুন শব্দ, শুনতে পাচ্ছি মায়ের ফিসফিসানি। এই ঘরেই হয়তো তাদের অসংখ্য হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে।
আমি আলমারিটা খুলি। ভেতরে কিছুই নেই, কেবল ধুলোর পুরু স্তর। নিরাশ হয়ে যখন বেরিয়ে আসতে যাব, তখন মেঝের দিকে চোখ পড়ল। ঘরের এক কোণে, যেখানে আগে হয়তো টেবিল ছিল, সেখানে মেঝের কাঠগুলো একটু আলগা মনে হলো।
আমি নিচু হয়ে আলগা কাঠটায় চাপ দিতেই সেটা সামান্য সরে গেল। নিচে একটা ছোট্ট খোপ, একটা ‘গোপন খোল’।
ভেতরে হাত দিতেই একটা পুরোনো, চ্যাপ্টা টিনের বাক্স হাতে উঠে এলো। বাক্সটা খুব ঠাণ্ডা, যেন বহু বছর ধরে মাটির নিচে ছিল।
আমার হাত কাঁপছিল। আমি বাক্সটা খুললাম। ভেতরে যা পেলাম, তা আমাকে স্তম্ভিত করে দিলো।
প্রথমেই চোখে পড়ল একটা নীল মলাটের ডায়েরি। আমার বাবার ডায়েরির মতোই, তবে এটায় লেখা আছে সুদেজ্ঞা অর্থাৎ আমার মায়ের নাম। মায়ের ডায়েরি!
ডায়েরিটার নিচে চাপা দেয়া আছে একটা ছোট রুপোর লকেট। লকেটটা দেখতে অনেকটা ম্যাপল পাতার মতো, আর এর ভেতরে খোদাই করা আছে ছোট্ট দুটি অক্ষর: ‘অ + জ’ (অরিমা এবং রবিন)।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা ছিল নীল ডায়েরির প্রথম পাতায়। সেখানে বাবার হাতের লেখায় লেখা, ঠিক যেন একটা চিঠি-
‘সুদেজ্ঞা,
জানি না, অরিমা যখন এই পাতাটা পড়বে, তখন তুমি কোথায়। আমি চাই না সে আমাদের ক’টা জানুক। শুধু জেনে রাখুক, সুরটা ভুল নয়, সুরটা হলো আমাদের বিচ্ছেদ-বিরহের সেতুবন্ধন। এই লকেটটা তাকে দিও। যখনই সে এই ম্যাপল পাতা দেখবে, সে যেন আমাদের গল্পটা বুঝতে পারে। আর... তোমার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, আমি সুরটা বদলে দিয়েছি। সুরটা এখন আর কলকাতা নয়, সুরটা এখন শিমলার।’
আমার হাত থেকে টিনের বাক্সটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। শিমলা? সুর বদলে দেয়া হয়েছে? আমার মা শেষ ইচ্ছা হিসেবে বাবার কাছে কী চেয়েছিলেন? আর কেনই বা তাদের কথা আমাকে জানানো হয়নি?
আমি এখন বুঝতে পারছি, ম্যাপল পাতার স্বরলিপির আসল অর্থটা কলকাতার এই ৪৬/বি ফ্ল্যাট নয়, এর পরের ধাপটা হলো সেই সুদূর শৈলশহর শিমলা।
মায়ের ডায়েরি হাতে নিয়ে ফ্ল্যাট নম্বর ৪৫/বি থেকে যখন বের হলাম, তখন কলকাতায় বিকেল গভীর। পুরনো বাড়ির আবছা আলো-ছায়া যেন আমাকে বিদায় জানাতে এলো। আমার মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটা রহস্যের সমাধান করছি না, বরং আমি আমার বাবা-মায়ের ভালোবাসার এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে স্পর্শ করছি।
ডায়েরিটা ছিল খুবই সংবেদনশীল। মা তাতে তার সমস্ত অনুভূতি, স্বপ্ন এবং বিশেষ করে বাবার প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসা লিখে গেছেন। পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটি জায়গায় এসে আমার চোখ থেমে গেল, সেখানে মা লিখেছিলেন, তাদের বিচ্ছেদের কারণ ছিল না ভালোবাসা, বরং ছিল মায়ের একটি জটিল অসুস্থতা, যার কথা বাবা কাউকে জানাতে দেননি। মা চেয়েছিলেন বাবা যেন তার স্মৃতি নিয়ে কষ্ট না পান, তাই তিনি জোর করে বাবার জীবন থেকে সরে গিয়েছিলেন, আর বাবাকে বলেছিলেন যেন তিনি তার নিজের একটা নতুন জীবন শুরু করেন। কিন্তু বাবা সেটা পারেননি। তিনি মায়ের সেই ইচ্ছে পূরণ করতে পারেননি, কিন্তু মায়ের শেষ ইচ্ছাটা রেখেছিলেন- সুরটা বদলে শিমলার কাছে গোপন করে রাখা।
কেন শিমলা? ডায়েরির শেষ পাতায় একটা ম্যাপল পাতার স্কেচ আঁকা, তার নিচে মায়ের হাতে লেখা- ‘আমাদের প্রথম শীত, যেখানে সুরটা সম্পূর্ণ হয়েছিল। ঠিকানা: ম্যাগনোলিয়া কটেজ।’ পরের দিন ভোরবেলা আমি শিমলার উদ্দেশে রওনা হলাম। এই যাত্রা কেবল একটি ভৌগোলিক স্থানান্তর ছিল না, এটি ছিল আমার বাবা-মায়ের আত্মার কাছে পৌঁছানোর এক তীর্থযাত্রা। ম্যাপল পাতা, লকেট, দুটি ডায়েরি, সব কিছুই আমার ব্যাগে যতেœ রাখা।
শিমলার আকাশ তখন মেঘে ঢাকা, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। ঠাণ্ডা হাওয়া যেন আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। আমি একটা পুরোনো ট্যাক্সি নিয়ে ম্যাগনোলিয়া কটেজের দিকে চললাম।
ম্যাগনোলিয়া কটেজ শহর থেকে কিছুটা দূরে, একটা পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত। এটি কোনো বিলাসবহুল জায়গা নয়, বরং একটা পুরোনো কাঠের বাড়ি, যার চারপাশে ম্যাগনোলিয়া আর ম্যাপল গাছে ঘেরা। বাড়িটার বারান্দা জুড়ে লাল, হলুদ ম্যাপল পাতা ছড়ানো।
ট্যাক্সি থেকে নেমে আমি কটেজের দরজার কাছে দাঁড়াই। দরজায় লাগানো একটা জং ধরা ঘণ্টা। ঘণ্টা বাজতেই এক বৃদ্ধ মহিলা বেরিয়ে এলেন। তার চোখে-মুখে আন্তরিকতার ছাপ।
আমি আমার পরিচয় দিলাম। বললাম, ‘আমার বাবা-মা প্রায় পঁচিশ বছর আগে এখানে এসেছিলেন, রবিন আর সুদেজ্ঞা। আমি তাদের স্মৃতি খুঁজতে এসেছি।’
বৃদ্ধা আমাকে দেখে হাসলেন। ‘রবিন আর সুদেজ্ঞা! আহা, কী সুন্দর জুটি ছিল! তারা এখানে তাদের প্রথম শীত কাটিয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্যও তারা আলাদা হতো না। রবিন প্রায়ই বলত, এই ম্যাগনোলিয়া কটেজ নাকি তাদের দ্বিতীয় বাড়ি।’
বৃদ্ধা আমাকে কটেজের ভেতরে নিয়ে গেলেন। আসবাবপত্রগুলো পুরোনো হলেও পরিপাটি। তিনি বললেন, রবিনবাবু প্রতি বছর ডিসেম্বরে একবার করে আসতেন, একা। তিনি কিছুদিনের জন্য থাকতেন, তারপর চলে যেতেন।
‘তবে শেষবার যখন রবিন এসেছিলেন,’ বৃদ্ধা বললেন, ‘তখন তিনি একটা কাজ করেছিলেন। খুব অদ্ভুত কাজ।’
তিনি আমাকে কটেজের পেছনের দিকের একটা ছোট বাগানে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটা বড়, পূর্ণাঙ্গ ম্যাপল গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যার নিচে বেতের একটা বেঞ্চি।
‘রবিন এখানটা খুব ভালোবাসতেন। বলেছিলেন, এখানে নাকি বসলে তিনি সুদে‘ার গান শুনতে পান,’ বৃদ্ধা বললেন। ‘আর, দেখুন এইখানে...’
তিনি ম্যাপল গাছের গোড়ার দিকে ইশারা করলেন। গাছের কাণ্ডের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট, পুরনো, পিতলের বাক্স স্ক্রু দিয়ে আটকানো ছিল। বাক্সটা ম্যাপল পাতার মতোই পুরনো দেখায়।
‘রবিনবাবু বলেছিলেন, এই বাক্স যেন কারো হাতে না পড়ে, যতক্ষণ না তার মেয়ে নিজে খুঁজে নেয়। তিনি বলেছিলেন, এটা তার আর সুদেজ্ঞার শেষ কথা।’
আমার চোখ ভিজে এলো। বাবা জানতেন, আমি ঠিক এইখানেই আসব। ম্যাপল পাতার স্বরলিপি আমাকে এই সুরের উৎস পর্যন্ত টেনে এনেছে।
বৃদ্ধার অনুমতি নিয়ে আমি বাক্সটা খুললাম। ভেতরে ছিল একটি ছোট অডিও টেপ এবং বাবার হাতের লেখায় একটি নোট।
নোটটাতে লেখা:
‘অরিমা,
যখন তুমি এটা পড়ছ, তখন আমি হয়তো সেই তৃতীয় পৃথিবীর খোঁজে বেরিয়ে গেছি, যে পৃথিবীতে সুদেজ্ঞা আমাকে একা রেখে গিয়েছিল। আমার মা, সুদেজ্ঞা, আমাকে অনুরোধ করেছিল গানটা বদলে দিতে, কারণ ওই গানে লুকিয়ে ছিল আমাদের বিচ্ছেদের গভীর কষ্ট। কিন্তু আমি পারিনি। আমি শুধু সুরের শেষ অংশটা বদলে দিয়েছি। এখন টেপটা চালাও। এই সুরটা সম্পূর্ণ, ঠিক আমাদের ভালোবাসার মতো। এই টেপটিই তোমার মায়ের শেষ ইচ্ছা- তোমার জন্য রেখে যাওয়া আমাদের শেষ গান।’
আমি কাঁপতে কাঁপতে ছোট টেপ রেকর্ডারটি চালু করি, যা আমি সঙ্গে করে এনেছিলাম। ম্যাগনোলিয়া কটেজের সেই শীতের বিকেলে, ম্যাপল গাছের নিচে বসে আমি শুনলাম সেই সুর। পুরোনো ভিনাইল ডিস্কের সেই বিষণœ সুরটি শুরু হলো, কিন্তু এবার এটি মাত্র এক মিনিট স্থায়ী হলো না। এটি চলতে থাকল, চলতে থাকল- তারপর সুরটা হঠাৎ করে বদলে গেল। বিষাদের সুর কেটে গিয়ে সেখানে যোগ হলো আনন্দময়, উচ্ছল রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি অংশ!
এটি ছিল মায়ের প্রিয় গান- ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। বাবা সেই বিরহের সুরের সাথে তার ভালোবাসার সুরটিকে জুড়ে দিয়েছেন। মা চেয়েছিলেন সুরটা বদলে যাক, আর বাবা সেটা করেছেন- তবে পুরোটা নয়। বাবা তার কষ্ট এবং মাকে হারানোর ভালোবাসাকে একসাথে গেঁথে এই সম্পূর্ণ স্বরলিপি তৈরি করেছেন।
আমি লকেটটা বুকের ওপর চেপে ধরলাম। ম্যাপল পাতার স্বরলিপি- যা বিচ্ছেদের সুর হয়ে শুরু হয়েছিল, তা শিমলার ম্যাগনোলিয়া কটেজে এসে ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ গানে রূপান্তরিত হলো।
ম্যাগনোলিয়া কটেজের সেই বেঞ্চিতে আমি আরও কিছুক্ষণ বসে রইলাম। চারপাশে ম্যাপল পাতার ভিড়। মাথার ওপর সেই পূর্ণাঙ্গ ম্যাপল গাছটা যেন নিঃশব্দে আমাকে আশীর্বাদ করছে। আমার কান দিয়ে তখনও আনন্দধারা বহিছে ভুবনের সুরটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
আসলে বাবা বা মা কেউই ভালোবাসার সুরটা পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেননি। মা চেয়েছিলেন বাবা যেন তার কষ্ট ভুলে যান, তাই তিনি গানটাকে বদলে দিতে বলেছিলেন। আর বাবা, তিনি মায়ের প্রতি তার প্রেম এবং স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করে রাখতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি মায়ের বিচ্ছেদের সুরটার সঙ্গে তাদের মিলনের গানটাকে জুড়ে দিলেন, এক অসম্পূর্ণ স্বরলিপিকে সম্পূর্ণ করলেন। বাবা জানতেন, একদিন আমি এই গান শুনতে পাব এবং বুঝতে পারব যে, তাদের গল্পটা বিচ্ছেদের নয়- এটা অমর প্রেমের গল্প।
‘সুরটা মনে রেখো, মা।’ বাবার সেই কথাটার অর্থ এখন স্পষ্ট হলো। সুরটা ছিল তাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি: প্রথমে বিষাদ, তারপর আশা, আর সবশেষে অনাবিল আনন্দ।
বৃদ্ধা কটেজের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তিনি আমাকে দেখে নরম হাসলেন। ‘আপনার বাবা-মা খুব খুশি হবেন, মা। আপনি তাদের কাজটা শেষ করলেন।’
আমি উঠে দাঁড়াই, চোখ মুছে তার কাছে যাই। ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে হয়তো এই গোপন স্বরলিপি কখনোই আমার কানে পৌঁছাতো না।’
বৃদ্ধা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘কিছু কিছু মানুষের গল্প শুধু বইয়ে থাকে না, মা। তাদের গল্প নিঃশ্বাসে, প্রকৃতির ফিসফিসানিতে লুকিয়ে থাকে। ম্যাপল পাতার এই গল্পটাও তাই।’
কলকাতা ফেরার পথে আমি লকেটটা আমার গলায় পরি। রুপোর সেই ম্যাপল পাতা এখন আমার হৃদয়ের খুব কাছে। এখন আর বাবা-মায়ের চলে যাওয়া আমাকে কাঁদায় না, বরং তাদের রেখে যাওয়া ভালোবাসা আমাকে শক্তি যোগায়।
ফ্ল্যাট নম্বর ৩বি-তে ফিরে এসে দেখি, জানালার পাশে সেই পুরনো ম্যাপল গাছটা তখনও পাতা ঝরাচ্ছে। তবে এবার পাতাগুলো আমার কাছে নীরবতার প্রতীক নয়, তারা যেন সঙ্গীতে পূর্ণ।
আমার জীবনের প্রথম তেইশটা বছর কেটেছে বাবার যতœ আর শাসনের মাঝে। বাবার চলে যাওয়ার পর আমি নিজেকে একা মনে করতাম। ভাবতাম, আমার জীবনে আর কেউ নেই। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, তাদের প্রেম, তাদের শিল্প, তাদের জীবনের গভীর দর্শন- সব কিছুই আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। আমার ডায়েরি টেবিলে নিয়ে আমি কলম ধরি। আমার হাতে এখন দুটি ডায়েরি- বাবার এবং মায়ের। আর আমার সামনে ম্যাপল পাতার স্বরলিপি।
আমি স্থির করি, আমি লিখব। লিখব তাদের সেই গোপন জীবনের কথা, লিখব ভালোবাসা আর ত্যাগের সেই অবিস্মরণীয় উপাখ্যান। যে সুর বিরহ দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেই সুরকেই আমি আমার কলমের ডগায় আনন্দ দিয়ে শেষ করব।
আমি আমার নতুন ডায়েরির প্রথম পাতায় লিখি- ‘ম্যাপল পাতার স্বরলিপি: তৃতীয় অধ্যায়’। এই তৃতীয় অধ্যায়টা আমার। যেখান থেকে আমি আমার নিজস্ব সুর তৈরি করব, যা হয় তো ভবিষ্যতে অন্য কাউকে তার জীবনের ‘আনন্দধারা’ খুঁজে নিতে সাহায্য করবে।
আমার বাবা-মা তাদের বিচ্ছেদের মাধ্যমে আমাকে শিখিয়ে গেলেন, জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যটা বাইরের পৃথিবীতে নয়, তা লুকিয়ে থাকে মানুষের হৃদয়ের গভীরে। তারা চলে গেলেও তাদের ভালোবাসা কখনো মরেনি- তা রয়ে গেছে একটি ম্যাপল পাতা আর একটি অসম্পূর্ণ সুরের মধ্যে। আর আমি, অরিমা, সেই সুরটাকে সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব নিলাম। আমার বাবা-মায়ের গল্প শেষ হলো, কিন্তু আমার জীবনের সুরটা কেবল শুরু হলো।
সেই দিন শিমলা ছাড়ার আগে আমি ম্যাগনোলিয়া কটেজের বাগান থেকে একটা কাজ করলাম। আমি বৃদ্ধার কাছে বাবার লাগানো সেই ম্যাপল গাছের একটা ছোট্ট চারা চাইলাম। বৃদ্ধা হেসে আমাকে একটি চারা তুলে দিলেন। তিনি বললেন, ‘এই চারাটা রবিনবাবুর ভালোবাসার মতোই বেড়ে উঠুক, মা।’
ফ্ল্যাট নম্বর ৩বি-তে ফিরে এসে আমি চারাটি জানালার ধারে রোপণ করলাম, ঠিক সেই পুরনো ম্যাপল গাছটার পাশেই। এখন আমার জানালায় দুটো ম্যাপল গাছ- একটি পুরনো, যা বাবার স্মৃতি বহন করে, অন্যটি নতুন, যা আমার ভবিষ্যৎকে আলিঙ্গন করে। এখন যখনই সেই পুরোনো ডিস্ক বা টেপ চালু হয়, সেই আনন্দধারা সুরটা আমার ঘর ভরে দেয়। আর আমি যখন এই নতুন চারাটির দিকে তাকাই, আমি বুঝতে পারি, আমার বাবা-মা তাদের গল্পটা শেষ করেননি- তারা কেবল তাদের অধ্যায় শেষ করেছেন। ম্যাপল পাতার স্বরলিপি আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা হারিয়ে যায় না, তা কেবল রূপ বদলায়, পুরনো পাতার মতো ঝরে গিয়ে নতুন জীবনের জন্ম দেয়।
আমি এখন আর একা নই। আমার পাশে রয়েছে বাবার ফেলে যাওয়া সাহস, মায়ের রেখে যাওয়া সুর আর একটি নতুন ম্যাপল চারা, যা প্রমাণ করে- ভালোবাসা হলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এবং সম্পূর্ণ স্বরলিপি।