টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে দেশীয় স্পিনিং মিল

শিল্পরক্ষায় ৭ প্রস্তাবনা শ্রমিক-কর্মচারীদের

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিযোগী দেশ ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও প্রণোদনায় বহু পিছিয়ে বাংলাদেশের স্পিনিং শিল্প। গ্যাস-বিদ্যুৎ ও শ্রম ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, সরকারি প্রণোদনা প্রত্যাহার এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের কারণে উৎপাদন খরচ আকাশছোঁয়া হওয়ায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও লোকসানের চাপে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্পরক্ষায় প্রণোদনাসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছেন স্পিনিং শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে স্পিনিং শিল্পে কর্মরত শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তারা শিল্পরক্ষায় সরকারকে সাত দফা প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তারা বলেন, প্রণোদনা প্রদান, আমদানি সক্ষমতা বাড়ানো ও নীতিগত সহায়তা ছাড়া স্পিনিং শিল্প টিকে থাকা সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের স্পিনিং বা সুতা শিল্প বর্তমানে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে। বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ-ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম যেখানে নিজস্ব কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেখানে বাংলাদেশের শিল্প পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। টেক্সটাইল মেশিনারি ও অ্যাক্সেসরিজ উৎপাদনে সক্ষমতা না থাকায় দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই ভারত-চীন-ভিয়েতনামের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। র ম্যাটেরিয়াল বা তুলা শতভাগ আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। অন্যদিকে, ভারত যে পরিমাণ তুলা উৎপাদন করে তাতে নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বাকি ৪০ শতাংশই রফতানি করে। চীন এতে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে কাঁচামালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব দিক থেকেই পিছিয়ে।

স্পিনিং মিল সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশের টেক্সটাইল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে উঠতে শুরু করেছে মাত্র ২৫ বছর আগে। তখন গ্যাসের দাম কম ছিল, মজুরি সাশ্রয়ী ছিল। তখন রফতানি খাতে সরকারি প্রণোদনা ছিল ২০-২৫ শতাংশ। এসব সুবিধা শিল্পকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি উল্টো। গত কয়েক বছরে গ্যাসের দাম পাঁচ দফায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। শ্রম মজুরি বেড়েছে। সরকারি প্রণোদনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ওভারহেড খরচ ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। উৎপাদন খরচ মার্কেট দামের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় বিশ^ প্রতিযোগিতায় টেকা বলা চলে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, বাংলাদেশের সুতার উৎপাদন খরচ যেখানে তিন ডলার ১০ সেন্ট প্রতি কেজি, সেখানে বিশ্ববাজারে বিক্রি হচ্ছে তিন ডলার ৬০ সেন্টে। ফলে প্রতি কেজিতে ৫০ সেন্ট লোকসান গুনছেন উদ্যোক্তারা। বিপরীতে ভারতের মিলগুলো ২.৪০ থেকে ২.৫০ ডলার প্রতি কেজিতে সুতা উৎপাদন করতে পারে। প্রণোদনা, নিজস্ব কাঁচামাল ও প্রযুক্তির কারণে ভারতীয় কোম্পানিগুলো লাভজনক অবস্থানে আছে। এই অস্বাভাবিক খরচ-ব্যবধানের সুযোগে প্রতিবেশী দেশগুলোর সুতা বাংলাদেশে ঢুকছে সস্তায়। গার্মেন্টস মালিকরা কম দামের কারণে দেশীয় সুতা না নিয়ে আমদানি করা সুতা ব্যবহার করছেন। এতে দেশীয় শিল্প আরো চাপে পড়ে যাচ্ছে। ফলে স্পিনিং শিল্পে বড় সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে পুঁজিসঙ্কটে। বাকি ৭০ শতাংশ মিলও অচিরেই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে কয়েক লাখ শ্রমিক-কর্মচারী চাকরিহীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাবে। পুরো আরএমজি ভ্যালু চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় টেক্সটাইল শিল্পটিকে রক্ষায় অবিলম্বে প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের জোরালো দাবি করেছেন স্পিনিং শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা। তারা দাবি করছেন, ‘ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ ভাগ শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা বেকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। বাকি শিল্প-কারখানাগুলো ক্রমান্বয়ে বন্ধ হওয়ার পথে।

সংবাদ সম্মেলনে যমুনা গ্রুপের পরিচালক এ বি এম সিরাজুল ইসলাম, গ্রিনটেক্স স্পিনিংয়ের নির্বাহী পরিচালক রুহুল আমিন ও সালমা গ্রুপের সিওও আজহার আলীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে সাত দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো- ১. গার্মেন্টস সেক্টরে ৫ শতাংশ প্রণোদনা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বিগত সরকারের শেষ সময়ে হঠাৎ করে ৫ শতাংশ থেকে ১.৫ শতাংশে নিয়ে আসে। গার্মেন্টসের এক্সপোর্টের ওপর দেশীয় সুতা ব্যবহারকারীদের জন্য ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেয়ার দাবি এবং সুতা আমদানির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ সেফগার্ড ডিউটি প্রয়োগ করতে হবে।

২. বিগত সরকার পরপর তিন ধাপে ৩৫০ শতাংশ গ্যাস এবং বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়েছে, ফলে টেক্সটাইল সেক্টরের পণ্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। তবে টেক্সটাইল সেক্টরের উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্য কোনোভাবেই সমন্বয় করা হয়নি। এতে করে স্পিনিং সেক্টরসহ সব ব্যাকওয়ার্ড শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই রফতানিকৃত পণ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল থেকে ৩০ শতাংশ রিবেট দিয়ে আপৎকালীন সময় (দুই বছরের জন্য) প্রণোদনা দিতে হবে। প্রতিযোগী দেশগুলো এই ধরনের সুযোগ দিয়ে আসছে।

৩. সুতা আমদানির ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি যে, সুতা রফতানিকারী দেশগুলোর সরকারের প্রণোদনার কারণে আমাদের দেশের উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে তারা সুতা রফতানি করছে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এন্টি ড্যাম্পিং ট্যাক্স/ সেফগার্ড ডিউটি প্রয়োগ করতে হবে।

৪. বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি এবং গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য আট বিলিয়ন ডলারের মতো ইডিএফ ফান্ড বরাদ্দ ছিল। যা কোনো ফ্যাক্টরির এক বছরের ইমপোর্ট অথবা ৩০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে যেটি বেশি তার সমপরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হতো। বর্তমান আপৎকালীন সময় থেকে উত্তরণের জন্য আগামী দুই বছরের জন্য উপরোক্ত সুবিধা পুনর্বহাল করতে হবে।

৫. এক্সপোর্ট পণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের ৭০ শতাংশ কাঁচামাল স্থানীয় উৎস থেকে খরচ করতে হবে।

৬. পণ্য বহুমুখীকরণ (রিসাইকেল এবং সাসটেইনেবল প্রোডাক্ট) ও ওই পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে রিসাইকেল এবং সাসটেইনেবল পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ (উপরোক্ত ১০ শতাংশ এর বাইরে) প্রণোদনা দিতে হবে। উল্লিখিত পণ্য উৎপাদনের জন্য স্পিনিং মিলের মেশিনারিজগুলোকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করার জন্য ৫ শতাংশ ইন্টারেস্ট ১০ বছর মেয়াদি বিশেষ প্যাকেজের ঋণ সহায়তা প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।

৭. বিগত বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ার ফলে প্রায় ৪০ ভাগ কাঁচামাল আমদানির সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে বর্তমানে কারখানাগুলোতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্যাপাসিটিতে চলছে। তাই পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদনসক্ষমতা ফিরিয়ে নিতে আমদানির ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে।