প্রতিষ্ঠার পর সর্বোচ্চ মুনাফা বিএসসির নতুন জাহাজ কেনার পরিকল্পনা

Printed Edition
3rd-1
বিএসসির সাধারণ সভায় নৌপরিবহন উপদেষ্টাসহ অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

চট্টগ্রাম ব্যুরো

নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের বন্দরগুলোর চারপাশে দীর্ঘদিন ধরে একটি মাফিয়া চক্র গড়ে উঠেছে। একজন মালেক চলে গেলে আরেক মালেক আসে-এভাবেই বছরের পর বছর একই চক্র আধিপত্য বজায় রেখেছে। চল্লিশ বছর ধরে একই ধরনের কর্মকর্তারা একই আচরণ চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন দেশ গড়তে হলে এই পুরনো ব্যবস্থা ভেঙে নতুনদের সুযোগ দিতে হবে।

গতকাল চট্টগ্রাম বোট ক্লাবে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ৪৮তম বার্ষিক সাধারণ সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

উপদেষ্টা বলেন, প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছরের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ নিট মুনাফা অর্জন করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। এই আর্থিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই নতুন জাহাজ কেনার সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সভায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী, বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং শেয়ারহোল্ডাররা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বিএসসির এমডি কমোডর মাহমুদুল মালেক শেয়ারহোল্ডার ও উপস্থিত সুধীবৃন্দের উদ্দেশে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদন অনুসারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএসসির পরিচালনা আয় ছিল ৫৯০.৯৮ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২০৭.৩০ কোটি টাকা। সর্বমোট আয় হয়েছে প্রায় ৭৯৮.২৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালনা ব্যয় ছিল ২৮৯.৯২ কোটি টাকা এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক খাতে ব্যয় ছিল ১২৬.৪৫ কোটি টাকা অর্থাৎ সর্বমোট ব্যয় হয় ৪১৬.২৭ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর সমন্বয়ের পর সংস্থার নিট মুনাফা হয়েছে ৩০৬.৫৬ কোটি টাকা, যা বিগত ৫৪ বছরে সর্বোচ্চ। এরপর তিনি গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সাথে তুলনা করে বলেন, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিএসসির মোট আয় হয়েছিল ৫৯৬.১৮ কোটি টাকা ও মোট ব্যয় হয়েছিল ৩১১.৫৯ কোটি টাকা এবং কর সমন্বয়ের পর নিট মুনাফা হয়েছিল ২৪৯.৬৯ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএসসির নিট আয় বেড়েছে প্রায় ৫৬.৮৭ কোটি টাকা।

বিএসসি পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক শেয়ারহোল্ডারদের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিট লাভ হতে ২৫ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ (ক্যাশ ডিভিডেন্ড) দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিএসসি নিজস্ব অর্থায়নে জাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে বিধায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গত বছরের সমপরিমাণ লভ্যাংশ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিএসসির লাভের ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে আরো বেশি লভ্যাংশ দেয়ার সুপারিশ করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী বিএসসির মোট সম্পদের পরিমাণ তিন হাজার ৫৮২.৯২ কোটি টাকা এবং মোট বহিঃদেনার পরিমাণ এক হাজার ৯৮৩.৭৭ কোটি টাকা।

সাধারণ সভায় জানানো হয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সুযোগ্য দিকনির্দেশনা ও সরকারের সক্রিয় সহযোগিতায় সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিএসসি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা, এসডিজি এবং ব্লু-ইকোনমির ধারণা বাস্তবায়নসহ বিএসসিকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদে বিএসসির বহরে বাণিজ্যিক জাহাজ সংযোজন ও আনুষঙ্গিক বিভিন্ন প্রকল্প/কার্যক্রম পরিচালনা ও বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে।

উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চীন সরকারের ঋণসহায়তায় গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছয়টি নতুন জাহাজ (প্রতিটি প্রায় ৩৯,০০০ ডিডব্লিউটি সম্পন্ন তিনটি নতুন প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার ও তিনটি নতুন বাল্ক ক্যারিয়ার) ক্রয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে যার মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি জাহাজ বিএসসির বহরে আছে। ওই জাহাজ বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিকভাবে নিয়োজিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন কর্তৃক প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ‘দু’টি প্রতিটি ৫৫,০০০-৬৬,০০০ ডিডব্লিউটি সম্পন্ন বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ অর্জন’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমোদনের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর বিএসসি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসির মধ্যে জাহাজ সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। চুক্তি মোতাবেক প্রথম জাহাজটি (এমভি বাংলার প্রগতি) ইতোমধ্যে বিএসসি বরাবর সরবরাহ করা হয়েছে এবং বাণিজ্যে নিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় জাহাজ এমভি বাংলার নবযাত্রা আগামী জানুয়ারি ২০২৬-এ বিএসসি বরাবর সরবরাহ করার সময়সূচি নির্ধারিত রয়েছে।

নতুন করে দু’টি তৈরি ট্যাংকার জাহাজ এবং একটি তৈরি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ ক্রয়েরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কনটেইনার পরিবহন বাণিজ্যে বৈশ্বিক ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় বিএসসির লাভজনক ও সফল অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে নতুন বারোটি সেলুলার করটেইনার জাহাজ (প্রতিটি ২,৫০০ থেকে ৩,০০০টিইইউএস) অর্জনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়।