এনসিটি হস্তান্তরে সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট
১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন আদালত
Printed Edition
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়ার সরকারি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্ট। আদালত জানতে চেয়েছে, এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বা সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদে কোনো আলোচনা কিংবা সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না।
গতকাল রোববার বিচারপতি মো: হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট পিটিশনের শুনানিকালে এই প্রশ্ন তোলেন। আদালত অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামানকে আগামী ১ জুলাইয়ের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এ সংক্রান্ত রিট দায়ের করেছে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম। জনস্বার্থে করা রিটে বলা হয়েছে, সরকারের বর্তমান প্রক্রিয়ায় কোনো প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার আহ্বান ছাড়াই সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টা চলছে। এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা ও আইন মানা ছাড়াই এগোচ্ছে, যা দেশের বিদ্যমান পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) আইন, ২০১৫ ও গিটুজি গাইডলাইন, ২০১৭-এর পরিপন্থী।
রিটে আরো বলা হয়, গিটুজি চুক্তির আওতায় কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে সরকারি প্রকল্পে দায়িত্ব দিতে হলে ন্যূনতম দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। অথচ পিপিপি কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে এনসিটি-সম্পর্কিত যে প্রকল্প প্রোফাইল আছে, সেখানে অনুমিত বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে মাত্র ২০০ কোটি টাকা, যা বিদ্যমান নীতিমালার পরিপন্থী।
আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে, যারা চায় না বন্দর আধুনিকায়ন হোক।’
রিটকারীদের পক্ষে আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘‘এর মাধ্যমে সরকার ‘লোকাল পিপল ডিসঅ্যালাউড’ করছেন।’’ এর জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এ বিষয়ে সরকারের ভেতরে আলোচনা চলছে, তবে জনসমক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সুতরাং এখানে স্থানীয়দের উপেক্ষা করার প্রশ্নই আসে না।’
আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও আইনজীবী আনোয়ার হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো: মহাদ্দেস-উল-ইসলাম, মাহফুজ বিন ইউসুফ ও মো: আসাদ উদ্দিন।
পূর্ববর্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে বর্তমান সরকার : আবেদনকারীর আইনজীবীদের দাবি, ২০১৯ সালে তৎকালীন সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে এনসিটির কনটেইনার হ্যান্ডলিং অপারেশনে তাদের যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। বর্তমান সরকারও কোনো টেন্ডার ছাড়াই এই উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। রিটকারীদের মতে, দেশের সক্ষম দেশীয় অপারেটরদের বাদ দিয়ে, ‘সবকিছু থাকা সত্ত্বেও কেন একটি বিদেশী কোম্পানির হাতে টার্মিনাল তুলে দেয়া হচ্ছে’- তা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
ন্যায্য দরপত্র ছাড়া চুক্তি নয়- হাইকোর্টে রুল চাওয়া : রিটে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে। আবেদনকারীরা হাইকোর্টে দু’টি রুল চেয়েছেন-
১. চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তির প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না।
২. যেকোনো অপারেটরকে দায়িত্ব দেয়ার আগে যথাযথ ও প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক বিডিং (দরপত্র আহ্বান) প্রক্রিয়া অনুসরণে সরকারকে নির্দেশ দেয়া হবে না কেন।
সংবাদ প্রকাশের পর রিট : রিটে একাধিক জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করা হয়। গত ২৫ মে রিটটি আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে আদালত বিষয়টি অবকাশ-পরবর্তী শুনানির জন্য রাখেন। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটির পর ২৩ জুন রিটটি আদালতে উপস্থাপন করা হয় এবং গতকাল ২৯ জুন মধ্যাহ্নবিরতির পর রিটের ওপর বিস্তারিত শুনানি হয়।
নজর এখন ১ জুলাইয়ের শুনানিতে সরকার যদি বিদেশী কোম্পানিকে এনসিটির দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে, তাহলে সেটা কোন আইন, নীতিমালা কিংবা উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার ভিত্তিতে হয়েছে- তা জানতে চেয়েছে আদালত। অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিষয়টি স্পষ্ট করতে বলা হয়েছে। পরবর্তী শুনানির তারিখ কাল মঙ্গলবার যেখানে সরকারপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। এই প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে যখন জাতীয় বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ স্বচ্ছতা এবং কৌশলগত অবকাঠামোতে বিদেশী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।